বিনোদন জগতের শিল্পীদের জীবন বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল এবং হাসিখুশি বলে মনে হয়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না বলা গল্প। ক্যামেরার সামনে তাঁদের হাসি, অভিনয় এবং সাফল্যের মুহূর্তগুলোই সাধারণ মানুষ বেশি দেখেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম, প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা কিংবা নিজের স্বপ্নকে কিছু সময়ের জন্য বিসর্জন দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের কথা অনেক সময়ই অজানাই থেকে যায়। একজন শিল্পীও আমাদের মতোই একজন মানুষ, যার জীবনে ভালোবাসা, দায়িত্ব, ত্যাগ এবং গভীর বেদনার অধ্যায় থাকে। সম্প্রতি এমনই এক হৃদয়স্পর্শী গল্প আবারও সামনে এসেছে, যা অনেকের চোখে জল এনে দিয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বর্ষীয়ান অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী বহু দশক ধরে তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করে চলেছেন।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে তাঁর এই সাফল্যের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তাঁর স্বামী অজিত কুমার ঘোষের। পেশায় তিনি ডেয়ারি ও ফার্মেসির ব্যবসায়ী ছিলেন। অভিনেত্রীর কথায়, তাঁর স্বামী নিজের ব্যবসা থেকে শুরু করে সঞ্চিত অর্থ, এমনকি বাড়ি এবং ফিক্সড ডিপোজিটের টাকাও তাঁর অভিনয় জীবনের পিছনে ব্যয় করেছিলেন। তিনি লিলি চক্রবর্তীকে একটাই কথা বলতেন “তুমি শুধু অভিনয় করে যাও।” সম্প্রতি অভিনেত্রীর একটি পুরনো সাক্ষাৎকার সমাজ মাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। সেই সাক্ষাৎকারেই উঠে এসেছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের কথা। লিলি চক্রবর্তী জানান, দীর্ঘদিন একটানা কাজ করার পর তাঁকে অভিনয় থেকে কিছুটা বিরতি নিতে হয়েছিল।
তাঁদের কোনও সন্তান ছিল না। তাই স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর দেখাশোনার সমস্ত দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন। তাঁর স্বামীর চোখের দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। একটি অপারেশনের সময় তাঁর রেটিনা ছিঁড়ে যায় এবং অন্য চোখেও সমস্যা ছিল। যদিও তিনি কখনও স্ত্রীকে কাজ করতে বাধা দেননি, তবুও সবসময় বলতেন, “সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসো।” প্রথমদিকে অভিনেত্রী সম্পূর্ণ কাজ ছাড়েননি। বছরে দু-একটি বা তিনটি ছবিতে অভিনয় করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একদিন তাঁদের বাড়ির ড্রাইভার বাড়িতে গিয়ে অনেকবার ডাকাডাকি করেও তাঁর স্বামীর কাছ থেকে কোনও সাড়া পাননি। এরপর তিনি লিলি চক্রবর্তীকে ফোন করেন।
অভিনেত্রীও বহুবার ফোন করলেও কোনও উত্তর মেলেনি। পরে তিনি শ্যামবাজারে থাকা তাঁর ননদকে খবর দেন। অনেক কষ্টে দরজা খুলে দেন তাঁর স্বামী। ঠিক সেই সময় লিলি চক্রবর্তীর ফোন আসতেই ফোনটি ধরেন তিনি এবং হঠাৎই পড়ে যান। সেই ঘটনার পর অভিনেত্রী সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আর নিয়মিত কাজ করবেন না। যদিও তখনও তাঁর কাছে একের পর এক কাজের প্রস্তাব আসছিল, কিন্তু সবই ফিরিয়ে দেন। এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বামীর আক্ষেপও ছিল। তিনি স্ত্রীকে বলতেন, “সকালের দিকে যদি কাজ করতে পারো, তাহলে একবার কথা বলে দেখো।” পরে তাঁরা ননদের বাড়িতেই থাকতে শুরু করেন, কারণ নিজের বাড়িতে তাঁর স্বামীর আর মন বসত না। এরপর হঠাৎই তাঁর স্বামীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। টানা ১৫ দিন হাসপাতালে থাকার পর তিনি বাড়ি ফেরেন।
আরও পড়ুনঃ “কোটি টাকা দিলেও তুমি সীমান্তে গিয়ে যু’দ্ধ করতে পারবে?” “তাঁদের ও পরিবারের আত্মত্যাগের মূল্য আমরা কোনওদিন শোধ করতে পারব না!” “অত্যন্ত লজ্জার! দেশের আসল হিরো, বীর জওয়ানদের নিয়ে এমন ভাষা মানা যায় না” প্রতিবাদ করো, কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অপমান নয়! ধিক্কার জানিয়ে, ভাইরাল ভিডিও নিয়ে ক্ষো’ভ উগরে দিলেন মাফিন চক্রবর্তী! ঠিক কী ঘটেছে?
সেই সময় লিলি চক্রবর্তীর একটি ছবির শুটিংয়ের দিন ছিল, যেখানে তিনি আগেই চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। সকালে তিনি স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শুটিং বাতিল করে তাঁর সঙ্গে থাকবেন কি না। উত্তরে তাঁর স্বামী বলেছিলেন, “আমি এখন পুরো সুস্থ। তুমি শুটিংয়ে যাও, বোনকে সঙ্গে নিয়ে যাও।” শুটিং ফ্লোরে পৌঁছে একটি দৃশ্যের শুটিং শেষ হতেই তাঁর বোন এসে জানান, বাড়ি থেকে ফোন এসেছে এবং জামাইবাবুর হয়তো শরীর খারাপ। অভিনেত্রী দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সঙ্গে যান প্রোডাকশন ম্যানেজারও। বাড়ির সামনে ভিড় দেখে তাঁর আর বুঝতে বাকি ছিল না জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন আর তাঁর পাশে নেই। ভালোবাসা, ত্যাগ এবং দায়িত্বের এই গল্প আজও প্রমাণ করে, একজন শিল্পীর সাফল্যের পিছনে অনেক সময় একজন নিঃস্বার্থ মানুষের নিঃশব্দ অবদান লুকিয়ে থাকে।






