বাংলা অভিনয় জগতের অন্যতম পরিচিত এবং দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় মুখ সব্যসাচী চক্রবর্তী। ফেলুদা চরিত্রে তাঁর অভিনয় যেমন দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে, তেমনই ‘গোরা’ থেকে শুরু করে অসংখ্য সিনেমা, টেলিভিশন এবং মঞ্চের চরিত্রে নিজের অভিনয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। কয়েক দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, বাংলা সংস্কৃতি ও সমাজজগতের একজন সচেতন মানুষ হিসেবেও পরিচিতি তৈরি করেছেন সব্যসাচী। তাঁর অভিনয় জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যশোধর সিদ্দারের মতো নাট্যব্যক্তিত্বের শিক্ষা, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, তপন সিনহা, অপর্ণা সেন, প্রভাত রায় থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট পরিচালকের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা। ফলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির দীর্ঘ পরিবর্তনেরও প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজ ও সময়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও নিজের মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায় সব্যসাচীকে। টালিগঞ্জের রাজনৈতিক পরিবেশ, শিল্পীদের স্বাধীনতা, কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমীকরণ, ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা এবং শিল্পীদের মানসিক চাপ একাধিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে যেমন বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের কাজ না পাওয়া নিয়ে হতাশ না হওয়ার পরামর্শ রয়েছে, তেমনই শুটিংয়ের সময় নিরাপত্তার অভাব নিয়েও রয়েছে সরব প্রতিবাদ। শিল্পী কোনও দৃশ্যে অস্বস্তি বোধ করলে তা পরিচালককে স্পষ্টভাবে জানানো উচিত বলে মনে করেন তিনি। আর রাজনীতির প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক এবং প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রতি তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধার কথা।
সেই সূত্রেই বুদ্ধদেবের রাজনৈতিক জীবন ও তাঁর পতনের পিছনে ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গও তুলেছেন অভিনেতা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে নিয়ে সব্যসাচীর মূল্যায়ন যথেষ্ট স্পষ্ট। তাঁর কথায়, বুদ্ধদেব ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম স্বচ্ছ মানুষ। একজন ‘পরিষ্কার হাতে’ রাজনীতিবিদ হওয়া এবং একজন ‘চালাক’ রাজনীতিবিদ হওয়া এক বিষয় নয় এই পার্থক্যটিই তুলে ধরেছেন তিনি। সব্যসাচীর মতে, বুদ্ধদেবের ক্ষেত্রে তাঁর স্বচ্ছতা এবং নীতির জায়গাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর বক্তব্যে এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে শুধু পরিষ্কার ভাবমূর্তি বা ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই রাজনৈতিক লড়াইয়ে টিকে থাকা যায় না। বরং ক্ষমতার কৌশল, প্রচার এবং রাজনৈতিক হিসাবও অনেক সময় বড় ভূমিকা নেয়। এই জায়গা থেকেই বুদ্ধদেবের পতন নিয়ে তাঁর মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ঠিক কী ধরনের ‘কুৎসিত ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল তা তিনি জানেন না, কিন্তু তাঁর মনে হয়েছে বুদ্ধদেবকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই ষড়যন্ত্রকারীরা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল। বুদ্ধদেবকে ঘিরে সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের গুলি চালানোর ঘটনাসহ তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সব্যসাচীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বুদ্ধদেবের আমলের নানা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ঘটনাকে পরবর্তীকালে যে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার পিছনে বৃহত্তর কৌশল কাজ করে থাকতে পারে। বিশেষ করে গুলি চালানোর মতো বিতর্কিত ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, সেটিও বুদ্ধদেবের সরকারকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এমনই ইঙ্গিত তাঁর কথায়।
তবে অভিনেতা নিজেই স্পষ্ট করেছেন, তিনি কোনও নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত জানেন না। তাঁর বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। তিনি মনে করেন, বুদ্ধদেবের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির একজন মানুষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার ক্ষেত্রে নানা প্রচার, কৌশল এবং ষড়যন্ত্র কাজ করে থাকতে পারে। অর্থাৎ গুলি চালানোর ঘটনাকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিকেও বুদ্ধদেবের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক আক্রমণের প্রেক্ষাপটে দেখছেন তিনি। এখানেই থেমে থাকেননি সব্যসাচী। তাঁর কথায় উঠে এসেছে বুদ্ধদেবের সঙ্গে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির সম্পর্কের প্রসঙ্গও। তাঁর মতে, বুদ্ধদেব বুঝতেন বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি রাজ্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ “শুরু থেকেই চাইতাম, আমার জীবনসঙ্গী যেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়…” টলিউডের দাপুটে অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন শকুন্তলা বড়ুয়া? ছোটবেলা থেকেই পরিচয়, একসময় নাকি প্রেমে পড়েছিলেন? কেন আর বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছল না সেই সম্পর্ক? এতদিনের নীরবতা ভেঙে অজানা অধ্যায় প্রথমবার প্রকাশ্যে আনলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী!
রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বুদ্ধদেবকে যথেষ্ট সম্মান করতেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে টালিগঞ্জের পরিবেশও বদলে যায় বলে আক্ষেপ তাঁর। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে একাধিক শিল্পীর কোণঠাসা হওয়ার প্রসঙ্গ এবং প্রশ্ন ওঠে, ইন্ডাস্ট্রির এমন পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী শিল্পীরা কেন সবসময় সরব হননি। সব্যসাচীর চোখে বুদ্ধদেব ছিলেন এমন এক মুখ্যমন্ত্রী, যিনি সংস্কৃতি ও শিল্পের গুরুত্ব বুঝতেন; কিন্তু রাজনৈতিক লড়াইয়ের কঠিন বাস্তবতায় তাঁর সেই অবস্থান শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি। বুদ্ধদেবের বিরুদ্ধে ঠিক কী ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁর কাছে নেই তবু তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি মনে করেন রাজনৈতিক কৌশল এবং প্রচারের কাছে একজন স্বচ্ছ রাজনীতিক পরাজিত হয়েছিলেন। আর সেই কারণেই বুদ্ধদেবকে নিয়ে সব্যসাচীর মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নয়, বরং বাংলার রাজনীতিতে স্বচ্ছতা বনাম রাজনৈতিক কৌশলের পুরনো দ্বন্দ্বকেও সামনে এনে দিয়েছে।






