‘বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করব না…ইন্টারনেটে পাওয়া কোনও তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না!’ নেতাজি বিত’র্কে সাফ কথা সুদীপ্তা চক্রবর্তীর! ‘মুড়ি আর মিছরি একই দরে বিকোচ্ছে’, সাংবাদিকতার মান নিয়েও প্রশ্ন তুললেন! স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বাংলায় ‘সামগ্রিক অবক্ষয়’ নিয়ে সরব অভিনেত্রী?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বাংলায় তৈরি হয়েছে বিতর্ক। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন টলিউডের একাধিক শিল্পী। পর্দার ‘সুভাষ’ অঙ্কিত মজুমদারও বিষয়টি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কথায়, নেতাজিকে দেশনায়ক বলা হয়, তার নিশ্চয়ই কারণ রয়েছে। ইতিহাস সম্পর্কে না জেনে এমন মন্তব্য করা কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন অভিনেতা। পরে অনন্ত মহারাজ সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিয়ো বার্তা দিয়ে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। এই আবহেই এবার পুরো বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান জানালেন অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী।

সম্প্রতি নিজের সমাজ মাধ্যমের পাতায় একটি দীর্ঘ পোস্ট করে গোটা ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন সুদীপ্তা। তাঁর পোস্ট থেকেই জানা যায়, এক সাংবাদিক ফোন করে অনন্ত মহারাজের নেতাজি সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চেয়েছিলেন। সুদীপ্তা জানান, তিনি বিষয়টি শুনেছেন ঠিকই, কিন্তু বিস্তারিতভাবে জানেন না। তাই সম্পূর্ণ তথ্য না জেনে সংবাদ মাধ্যমে মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি। তিনি স্পষ্ট বলেন, “বিস্তারিত না জেনে কোনও মন্তব্য করব না গো।” এমনকি সাংবাদিক যখন তাঁকে ‘গুমনামি’ ছবিতে অভিনয়ের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করেন, তখনও তিনি সেই তথ্য সংশোধন করে দেন। সুদীপ্তার দাবি, তিনি ‘গুমনামি’ ছবিতে অভিনয় করেননি, অথচ ইন্টারনেটে থাকা তথ্য দেখিয়ে তাঁকে তা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়।

এই জায়গাতেই সাংবাদিকতার তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিনেত্রী। সুদীপ্তার বক্তব্য, ইন্টারনেটে কোনও তথ্য থাকলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে বিনোদন জগতের খবর করতে গেলে সংশ্লিষ্ট সিনেমা বা কাজ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন বলেই মনে করেন তিনি। সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাঁর প্রশ্ন ছিল, “আপনি ইন্টারনেট দেখে সাংবাদিকতা করছেন?” এরপর তিনি বলেন, “বিনোদন জগৎ নিয়ে খবর করতে গেলে সেগুলো একটু দেখতে হবে তো নাকি? শুধু ইন্টারনেট দেখলে হবে?” এই কথোপকথনের পর ফোন রেখে দেন অভিনেত্রী। পরে নিজের পোস্টে জানান, সাধারণত তিনি কোনও সাংবাদিকের সঙ্গে এভাবে ফোন রেখে দেন না।

এই বিষয়টি নিয়ে তাঁর খারাপও লেগেছিল। এমনকি পরে ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ করে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন বলে জানিয়েছেন সুদীপ্তা। তবে তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় শুধুমাত্র ওই সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। বরং গোটা বিনোদন সাংবাদিকতার মান এবং সময়ের সঙ্গে তার পরিবর্তন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সুদীপ্তার মতে, তাঁর অভিনয় জীবনের শুরুর সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার আগে নিজেদের যথেষ্ট প্রস্তুত করতে হত। শিল্পী বা তাঁর কাজ সম্পর্কে জেনে তারপর সাক্ষাৎকার নেওয়ার রীতি ছিল বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গায় অনেকটাই অবনতি হয়েছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, “মুড়ি আর মিছরি একই দরে বিকোচ্ছে।”

তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার চেয়ে তিনি সামগ্রিক পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বলেই পোস্টে স্পষ্ট করেছেন। এরপর বিনোদন সংবাদের বিষয় নির্বাচন নিয়েও সরব হন সুদীপ্তা। তাঁর মতে, কোনও অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চর্চা বা সম্পর্ক সংক্রান্ত খবর সহজেই শিরোনাম হয়ে যায়। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের কাজ কিংবা আন্তর্জাতিক মানের কোনও কাজ নিয়ে একইভাবে আগ্রহ দেখা যায় না। এই প্রসঙ্গে তিনি সিনেমাটোগ্রাফার অভীক মুখোপাধ্যায়ের কাজের উল্লেখ করেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, আদিত্য চোপড়া, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, সুজিত সরকার, বৌদ্ধায়ন মুখোপাধ্যায়, শাদ আলি, অনীক দত্ত এবং অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করা অভীক মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি কলকাতাতেই মণিরত্নমের আগামী ছবির শুটিং করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ ‘‘এরা রাতে ঘুমোয় কী করে? মোদির বিরুদ্ধে কথা বলে ভোট নিয়ে এখন তাঁর সঙ্গেই দাঁত বার করে বিস্কুট!‘’ ‘না ঘরকা না ঘাটকা, লোভের জন্যই সব শেষ!’ একদা তৃণমূলের পক্ষে সরব কৌশিক সেনের নিশা’নায় এবার ‘দলবদলু’ তারকা নেতা-নেত্রীরা! দেব, সায়নী ও রচনা, ‘ভালো তৃণমূল’দের কীভাবে আয়না দেখালেন? এখনও কি মমতা-পন্থীই তিনি, জানালেন অভিনেতা?

কিন্তু সেই কাজ নিয়ে বিনোদন সাংবাদিকদের যথেষ্ট আগ্রহ না দেখানোয় কষ্ট পেয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, শিল্পীদের কাজের বদলে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা নিয়েই তাঁর আপত্তি। সবশেষে সুদীপ্তা স্পষ্ট করে দেন, তাঁর এই লেখা কোনও নির্দিষ্ট সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে নিশানা করে নয়। বরং তিনি বিনোদন জগত এবং বিনোদন সাংবাদিকতার সামগ্রিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই কথাগুলি বলেছেন। তাঁর মতে, যে জগতের মানুষের কাজ দর্শককে বিনোদন দেওয়ার কথা, সেই কাজের খবর তুলে ধরাই বিনোদন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব। কিন্তু সংবাদমাধ্যম নিজেই যখন চমক তৈরি করার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেখান থেকেই সমস্যার শুরু বলে মনে করেন তিনি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তাঁর এই পোস্ট নিয়েও হয়তো ‘বিস্ফোরক সুদীপ্তা’ বা ‘ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সুদীপ্তা’র মতো শিরোনাম তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য, “এ লেখা কোনও একজন দুজন সাংবাদিক বা সংবাদ সংস্থাকে ‘টার্গেট’ করে নয়।” পুরো বিষয়টিকে তিনি “Overall decay” বা সামগ্রিক ক্ষয় হিসেবে দেখছেন এবং সেই জায়গা থেকেই তাঁর আক্ষেপ।

You cannot copy content of this page