ভোররাতে আচমকাই ঘুম ভাঙল উত্তম কুমারের! স্বপ্নে এসেছিলেন স্বয়ং বিঘ্নহর্তা শ্রী গণেশ! মহানায়ককে কী বিশেষ নির্দেশ দেন তিনি? কী এমন দেখেন স্বপ্নাদেশে যে রাতারাতি বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন বিগ্রহ? কীভাবে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে শুরু হল গনেশ পুজো? জানুন সেই অলৌকিক কাহিনী, যা আজও শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়!

মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা স্মৃতি আজও বাঙালির কাছে সমান আকর্ষণের। বিশেষ করে ভবানীপুরের বাড়িতে তাঁর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। সেই পুজোয় তৎকালীন টলিউডের বহু পরিচিত মুখের পাশাপাশি নিজেও নানা কাজে যুক্ত থাকতেন উত্তম কুমার। তবে তাঁর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে হওয়া গণেশ পুজোর কথা অনেকেরই হয়তো জানা নেই। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির প্রথম তারকা হিসেবে নিজের বাড়িতে বড় করে গণেশ পুজো শুরু করেছিলেন মহানায়কই। প্রতি বছর গণেশ চতুর্থীর দিন তাঁর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে বিশেষ আয়োজন করা হত। সময়ের সঙ্গে সেই পুজো শুধু পারিবারিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছিল টলিউডের পরিচিত এক মিলনক্ষেত্র।

এই পুজোর শুরু নিয়েও রয়েছে বেশ অন্যরকম একটি ঘটনা। কাজের সূত্রে সেই সময় বম্বে, অর্থাৎ বর্তমান মুম্বইয়ে যাতায়াত ছিল উত্তম কুমারের। সেখানে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন গণপতি উৎসবের বড় আয়োজন এবং তার জাঁকজমক। এমনকী, বিখ্যাত অভিনেতা রাজ কাপুরের বাংলোয় আয়োজিত গণেশ পুজোয়ও নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। সেখানে পুজোর নিয়মকানুন এবং উৎসবের পরিবেশ তাঁকে বেশ মুগ্ধ করেছিল। তাই অনেকের ধারণা ছিল, মুম্বইয়ের সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো কলকাতায় নিজের বাড়িতে গণেশ পুজো শুরু করেছিলেন মহানায়ক। কিন্তু উত্তম কুমারের ঘনিষ্ঠ মহলের সূত্রে পাওয়া কাহিনি বলছে, এর নেপথ্যে ছিল আরও ব্যক্তিগত এবং অলৌকিক একটি ঘটনা।

ঘটনাটি গত শতকের ষাটের দশকের। বম্বে থেকে কলকাতায় ফেরার পর একদিন ভোরে আচমকাই ঘুম ভেঙে যায় উত্তম কুমারের। তিনি সঙ্গে সঙ্গে পাশে থাকা সুপ্রিয়া দেবীকে ডেকে তোলেন এবং নিজের দেখা স্বপ্নের কথা জানান। মহানায়ক জানিয়েছিলেন, স্বপ্নে তিনি বিঘ্নহর্তা শ্রী গণেশের দর্শন পেয়েছেন। সেই স্বপ্নেই তিনি ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে গণপতি বাপ্পাকে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ পেয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন। এরপর আর দেরি করেননি উত্তম কুমার, স্বপ্নে পাওয়া সেই নির্দেশ মেনেই বাড়িতে গণেশ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মহারাষ্ট্রের প্রচলিত গণেশ মূর্তির ধরন হুবহু অনুসরণ না করে, স্বপ্নে দেখা রূপের সঙ্গে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া রেখে সাজানো হয়েছিল সেই বিগ্রহ।

গণেশ মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর প্রতিদিনের পুজোতেও নিজেই যুক্ত থাকতেন উত্তম কুমার। কোনও পুরোহিতকে দিয়ে নিত্যপুজো না করিয়ে মহানায়ক নিজের হাতেই গণেশের পুজো করতেন। প্রতিদিন ভোরে হাওড়া ফুলবাজার থেকে আসত তাজা পদ্ম ও জুঁইয়ের মালা। সেই ফুল দিয়েই নিয়মিত গণেশের পুজো করতেন তিনি। এছাড়াও শহরের পরিচিত সতীশ ময়রার দোকান থেকে নিয়ম করে আসত মোদক। তবে সাধারণ দিনের পুজোর তুলনায় গণেশ চতুর্থীর আয়োজন ছিল অনেক বড়। সেদিন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে নিজেই নিয়ম মেনে পুজোয় বসতেন উত্তম কুমার, আর বাড়ির রান্নাঘরের দায়িত্ব সামলাতেন সুপ্রিয়া দেবী।

আরও পড়ুনঃ ইংরেজিতে উত্তর দিতে গিয়ে একের পর এক ভুল! মাঝপথেই থামিয়ে দেওয়া হল সাক্ষাৎকার, জাতীয় মঞ্চে উত্তম কুমারকে নিয়ে শুরু হয়েছিল অ’স্বস্তি! বন্ধুর এক কথায় তারপর কী করলেন মহানায়ক? কয়েক মাস পর যা দেখা গেল একেবারে অবিশ্বাস্য?

গণেশ চতুর্থীর ভোগেও থাকত একেবারে বাঙালি ঘরানার নানা পদ। খিচুড়ি, লাবড়া, পোলাও, আলুর দম, ছানার ডালনা, চাটনি এবং পায়েসের সঙ্গে থাকত সতীশ ময়রার বিশেষ মোদক। তবে পুজোর মূল আয়োজন শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা নামলেই ময়রা স্ট্রিটের বাড়ির পরিবেশ আরও জমজমাট হয়ে উঠত। প্রদীপ ও আলোর সাজে সেখানে বসত টলিউডের নামী শিল্পীদের নিয়ে সংগীতের আসর। তৎকালীন বাংলা বিনোদন জগতের বহু পরিচিত মানুষ সেই জলসায় যোগ দিতেন। এমনই এক গণেশ চতুর্থীর পুজোর পরের অনুষ্ঠানে উত্তম কুমার এবং সুরসম্রাট হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অসাধারণ যুগলবন্দীর সাক্ষী হয়েছিল টলিপাড়া। এইভাবেই মহানায়কের ময়রা স্ট্রিটের গণেশ পুজো শুধু একটি পারিবারিক ধর্মীয় আয়োজন ছিল না, সময়ের সঙ্গে তা হয়ে উঠেছিল বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা এক স্মরণীয় অধ্যায়।

You cannot copy content of this page