“আমার একটা বড় অসুখ করেছিল, আজ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে আমি…” ভুগেছেন অসম্ভব মানসিক য’ন্ত্রণায়! কোন ‘রোগে’ আ’ক্রান্ত বিশ্বনাথ বসু? নিজের জীবনের অজানা অধ্যায় ফাঁস করলেন অভিনেতা?

বাংলা টলিউডের পরিচিত মুখ বিশ্বনাথ বসু দীর্ঘদিন ধরে দর্শকদের মন জয় করে আসছেন। সিনেমা থেকে সিরিয়াল, বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁর অভিনয় নজর কেড়েছে দর্শকের। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবারকে নিয়েই সাধারণভাবে জীবন কাটাতে পছন্দ করেন অভিনেতা। তবে তাঁর অভিনয় জীবনের শুরুতেই এমন একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যা পরে তাঁকে ভাবিয়েছিল। একসময় পুরস্কার পাওয়ার প্রতি তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল প্রবল আগ্রহ। প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার আক্ষেপ থেকেই সেই বিষয়টি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে মানসিক চাপের কারণ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই সময়ের অভিজ্ঞতা এবং পুরস্কার নিয়ে বদলে যাওয়া ভাবনার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন বিশ্বনাথ।

বিশ্বনাথ নিজেই সেই সময়ের সমস্যাটিকে মজা করে ‘অ্যাওয়ার্ড অসুখ’ বলে উল্লেখ করেছেন। অভিনেতার কথায়, “আমার একটা বড় অসুখ করেছিল, ‘অ্যাওয়ার্ড অসুখ’।” ফর দ্য টাইমিং একটা খুব বিখ্যাত অ্যাওয়ার্ড আমাকে দেওয়া হয়েছিল। পরেরবার আমার আরেকটা সিনেমা ছিল, যেটা গ্রাম-শহর মিলিয়ে দেওয়া যেতে পারতো, কিন্তু আমাকে দেওয়া হয় না।” একটি পুরস্কার পাওয়ার পর পরেরবারও একই ধরনের স্বীকৃতির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তাঁর মনে। কিন্তু পরের ছবির ক্ষেত্রে সেই সম্মান না মেলায় হতাশা তৈরি হয়। ধীরে ধীরে পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছেটাই তাঁর মনে একটি আলাদা জায়গা করে নেয়। প্রাপ্য স্বীকৃতি না পাওয়ার কষ্টও সেই সময় তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। তবে পরে এক সহকর্মীর বাস্তববোধ এবং একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা তাঁকে সেই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।

Bengali actor

এই পরিবর্তনের পিছনে অভিনেতা রজতাভ দত্তের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছেন বিশ্বনাথ। পুরস্কার নিয়ে তাঁর এই মানসিক যন্ত্রণা কাটাতে রজতাভ তাঁকে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করেছিলেন। বিশ্বনাথের কথায়, রজতাভ দত্ত বলেছিল, ‘টাকাটা পেয়েছিস?’ সহকর্মীর এই সহজ প্রশ্নই তাঁকে পুরস্কারের বাইরের বাস্তব দিক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। এরপর একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি নিজের চোখে এমন কিছু বিষয় দেখেন, যা তাঁর চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে। তিনি বুঝতে পারেন, কোনও পুরস্কার পাওয়ার পিছনে শুধুমাত্র অভিনয়ের যোগ্যতাই সবসময় একমাত্র বিষয় নয়। সেই উপলব্ধির পর নিজের পুরস্কারের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণকে নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন তিনি।

এরপর নিজের পুরনো ভাবনার দিকে ফিরে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলেন বিশ্বনাথ। তিনি নিজের উদ্দেশে বলেন, “বিশ্বনাথ তুমি মুখে বলছো যে দর্শক আমার ভগবান, সে আমাকে রোজ ডেকে নিয়ে যায়, আর তার দেওয়া যে তোমার বাড়িতে আর রাখা যাচ্ছে না, দেশের বাড়িতে রাখা হয় যে মেমেন্টোগুলো দেওয়া…ওগুলোকে তুমি বিশ্বাস করো না! কত বড় বদমাইশ তুমি বলো বিশ্বনাথ!” দর্শকদের ভালোবাসা ও তাঁদের দেওয়া স্বীকৃতিকে সামনে রেখে নিজের মানসিক অবস্থার সঙ্গে এই দ্বন্দ্বের কথা তিনি তুলে ধরেন। এরপর থেকেই পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছাকে আর নিজের কাজের মূল লক্ষ্য হিসেবে রাখেননি অভিনেতা। বরং দর্শক তাঁকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, সেটাকেই তিনি নিজের কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখতে শুরু করেন। প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানের বদলে মানুষের ভালোবাসার মূল্য তাঁর কাছে অনেক বেশি হয়ে ওঠে। এই উপলব্ধিই পুরস্কার নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে।

আরও পড়ুনঃ কোনমতেই শ’রীর থেকে সরানো যাবে না! বিগ বসের ঘরে সারাক্ষণ কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে ঘোরেন প্রতিযোগীরা, এর ভিতরে কী কী এমন থাকে জানেন? কেন খুলতে পারেন না ইচ্ছেমতো? খুললে কী শা’স্তি হতে পারে?

এখন কোনও স্বীকৃত পুরস্কার না পেলেও সেই বিষয়টি তাঁকে আগের মতো কষ্ট দেয় না বলে জানিয়েছেন বিশ্বনাথ। অভিনেতার কথায়, “আজ থেকে জীবনের লাস্ট দিন, পৃথিবীতে আমি যদি কোনরকম স্বীকৃত কৃত পুরস্কার নাও পাই আমার কষ্ট ১০০ ভাগের মধ্যে দু ভাগ হতে পারে, তার বেশি আর উঠবে না।” অর্থাৎ পুরস্কার তাঁর কাছে এখন আর সাফল্যের মাপকাঠি নয়। দর্শকের ভালোবাসা এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতিকেই তিনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সাড়া তাঁর কাছে যে কোনও ট্রফি বা পুরস্কারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় যে পুরস্কারের প্রত্যাশা তাঁকে মানসিকভাবে কষ্ট দিত, আজ সেই জায়গাতেই এসেছে সম্পূর্ণ অন্য উপলব্ধি। বিশ্বনাথের এই অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয় জীবনের পাশাপাশি স্বীকৃতি এবং দর্শকের ভালোবাসা নিয়ে বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির কথাও সামনে এনেছে।

You cannot copy content of this page