একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যা নামলেই টেলিভিশনের সামনে একসঙ্গে বসে পড়ত গোটা পরিবার। তখন বিনোদনের মাধ্যম এত বেশি ছিল না, ছিল না হাতে হাতে মোবাইল, একের পর এক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম কিংবা মুহূর্তে বদলে যাওয়া অসংখ্য সিরিয়াল। তাই টেলিভিশনের পর্দায় শুরু হওয়া একটি ধারাবাহিকই হয়ে উঠত পরিবারের আড্ডার বিষয়। গল্পের চরিত্রগুলো যেন ধীরে ধীরে ঘরেরই মানুষ হয়ে উঠত। ১৯৮০-র দশকের বাংলা ধারাবাহিকের গল্পে সেই সাধারণ জীবনের টান, সম্পর্কের উষ্ণতা আর চেনা মানুষের সুখ-দুঃখের ছাপ ছিল। আজকের দ্রুতগতির বিনোদনের সময়ে সেই ধরনের গল্পের অভাবই যেন আরও বেশি করে অনুভব করেন বাংলা ধারাবাহিকের দর্শকরা।
এই নস্টালজিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জোছন দস্তিদারের পরিচালনায় তৈরি বাংলা ধারাবাহিক ‘তেরো পার্বণ’-এর নাম। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত আটটায় টেলিভিশনের সামনে বসতেন দর্শকরা। শুধু ধারাবাহিক হিসেবে নয়, ‘তেরো পার্বণ’ হয়ে উঠেছিল এক সময়ের সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ। এই ধারাবাহিক থেকেই দর্শকদের কাছে পরিচিতি পান একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী। সব্যসাচী চক্রবর্তী, খেয়ালী দস্তিদার, ইন্দ্রাণী হালদারের মতো শিল্পীদের অভিনয়জীবনের শুরুর দিকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই ধারাবাহিকের স্মৃতি।
আজ এত বছর পরেও ‘তেরো পার্বণ’-এর কথা উঠলে অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পুরনো টেলিভিশনের দিনগুলি। জোছন দস্তিদারের গল্প বলার ধরনে ছিল ঘরের মানুষের জীবনের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা। তাই ধারাবাহিকের চরিত্র বা ঘটনাগুলিকে আলাদা কোনও জগতের বলে মনে হত না। বরং মনে হত, পাশের বাড়ির কোনও পরিবার, পরিচিত কোনও মানুষ কিংবা নিজেদের জীবনেরই কোনও গল্প যেন পর্দায় ফুটে উঠছে। সেই কারণেই ধারাবাহিকটি শেষ হয়ে যাওয়ার বহু বছর পরেও দর্শকদের মনে তার জায়গা মুছে যায়নি। সময় বদলেছে, টেলিভিশনের গল্পের ধরন বদলেছে, কিন্তু সেই সহজ সম্পর্কের গল্প আর পারিবারিক আবহের জন্য পুরনো দর্শকদের একটা আলাদা টান এখনও রয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন: রবিবাসরীয় সকালেই টলিপাড়ার দারুণ সুখবর! অপেক্ষার অবসান, শোভন-সোহিনীর কোলে এল প্রথম সন্তান! ছোট্ট রাজপুত্র নাকি রাজকন্যা, তারকা দম্পতির ঘর আলো করতে এল কে?
‘তেরো পার্বণ’-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জোছন দস্তিদারের ব্যক্তিগত জীবনও কম গল্পের নয়। চন্দ্রার সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন তিনি। ১৯৬১ সালে তাঁদের বিয়ের সময় জোছনের কোনও স্থায়ী চাকরি ছিল না। নাটকই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। চন্দ্রা তখন চাকরি করতেন এবং তাঁর উপার্জনেই কোনওরকমে সংসার চলত। ১৯৬৩ সালে তাঁদের মেয়ে খেয়ালি দস্তিদারের জন্ম। সংসারে তখনও অভাব ছিল। মেয়ের দুধ কেনার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হত তাঁদের। এর মধ্যেও নাটকের কাজ ছাড়েননি জোছন। ‘অমর ভিয়েতনাম’ নাটক নিষিদ্ধ হওয়ার পর ঘনিষ্ঠরা তাঁকে সংসারের কথা ভেবে অন্য কাজ করার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শে ১৯৬৭ সালে তিনি ‘অর্কিড’ নামে একটি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন সেন্টার তৈরি করেন। ধীরে ধীরে সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি হয়।
জোছন ও চন্দ্রার সম্পর্কের গল্পেও নাটকের একটা বড় ভূমিকা ছিল। চন্দ্রা ছিলেন স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে এবং নিয়মিত গাড়িতে করে রিহার্সালে আসতেন। প্রথম দেখাতেই তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন জোছন। বন্ধুর মাধ্যমে প্রেমের কথা জানিয়েও প্রথমে প্রত্যাখ্যাত হন, পরে আবার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কই পরিণতি পায় বিয়েতে। জীবনের পরের সময়েও তাঁদের সম্পর্কের ভিত ছিল পারস্পরিক বোঝাপড়া। চন্দ্রার কথায়, নানা বিষয়ে তাঁদের মতের অমিল থাকলেও মনের মিল ছিল গভীর। মাসের প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার পর দুজনে একসঙ্গে ‘অমলেট’ খেতে খেতে রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। ‘তেরো পার্বণ’-এর মতোই তাঁদের জীবনের এই গল্পও আজকের দর্শকের কাছে যেন হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের ছবি যে সময়ে বিনোদন মানে শুধু পর্দার গল্প ছিল না, সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত মানুষের নিজের জীবন, সম্পর্ক আর অসংখ্য স্মৃতি।






