মানুষের জীবন কখন যে কোন দিকে মোড় নেয়, তা সত্যিই বলা কঠিন। একসময় যে পরিবারে ছিল পরিচিতি, স্বচ্ছলতা আর শিল্পজগতের সঙ্গে যোগ, সময়ের নিয়মে সেই জীবনেই নেমে আসতে পারে নিঃসঙ্গতা। কাছের মানুষ হারিয়ে, পরিবারের পরিসর ছোট হতে হতে একসময় চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে শেষ আশ্রয়। তেমনই এক বাস্তব ছবি উঠে এল সোনারপুরের একটি বৃদ্ধাশ্রমে। কিংবদন্তি অভিনেতা রবি ঘোষের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত এক সদস্যার বর্তমান জীবন যেন সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
রবি ঘোষের ভাতৃবধূ সুমিতা ঘোষ দস্তিদারের জীবনের গল্পে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক পরিচিত নাম। তাঁর ভাসুর ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা রবি ঘোষ। সুমিতা দেবীর স্বামীর নাম ছিল দিবেন্দ্রনাথ। তাঁর নিজের কথাতেই জানা যায়, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে অভিনয় জগতেরও যোগ ছিল। তাঁর ছেলে সুমন ঘোষও অভিনয় করেছেন। জয় বাহাদুরের সঙ্গে ‘সাধু কর্তা’ ছবিতে কাজ করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অর্থাৎ একসময় যে পরিবারের সঙ্গে বাংলা বিনোদন জগতের মানুষের যোগাযোগ ছিল, আজ সেই পরিবারেরই এক সদস্যকে কাটাতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমের নিরিবিলি জীবনে।
বর্তমানে সোনারপুরের নিবেদিতা ভবন বৃদ্ধাশ্রমই সুমিতা দেবীর ঠিকানা। প্রায় চার বছর ধরে তিনি সেখানে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গে নিজের জীবনের নানা কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাছের মানুষজন আর পাশে নেই। একসময় পরিবারের যে পরিসর ছিল, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছে। নিজের কথায় তিনি জানান, পাড়ার এক বান্ধবী তাঁকে এখানে নিয়ে আসেন। বর্তমানে এই আশ্রমই তাঁর আশ্রয়। চারপাশে অন্য আবাসিকরা থাকলেও নিজের জীবনের পুরনো দিনগুলির স্মৃতি নিয়েই সময় কাটছে তাঁর। কিংবদন্তি অভিনেতার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও জীবনের শেষ অধ্যায়ে যে এমন নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হতে হবে, তা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
এই পরিস্থিতিতেই সুমিতা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে যান সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক তথা অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিজের পুরনো দিনের স্মৃতির কথাও জানান রূপা। তিনি বলেন, চলচ্চিত্র জগতে তাঁদের পরিচিত বহু মানুষ নিজেদের শেষ জীবন সেভাবে গুছিয়ে রাখতে পারেননি। সেই সমস্ত শিল্পী ও টেকনিশিয়ান এবং তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ‘সিনেটাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর মতো সংগঠন কাজ করে বলেও জানান তিনি। আশ্রমে এসে সুমিতা দেবীর সঙ্গে কথা বলে তাঁর প্রয়োজনের বিষয়গুলিও জানার চেষ্টা করেন রূপা। তাঁর কথায়, নিজের চোখে না দেখলে কোথায় কী প্রয়োজন, তা বোঝা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুনঃ মেয়ের সাফল্যের নেপথ্যে নীরব শক্তি, প্রয়াত কৃষ্ণা মুখার্জি! মাতৃহারা হলেন রানি মুখার্জি! কঠিন সময়েও হাসতে শিখিয়েছিলেন মা, আজ তার চিরবিদায়ে অভিনেত্রীর জীবনে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া! মৃ’ত্যুকালে কী হয়েছিল তাঁর মায়ের?
এদিন সুমিতা দেবীর হাতে ফলমূল, হরলিক্স, মিষ্টি-সহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। পাশাপাশি তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেন। রূপার এই সাক্ষাতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সুমিতা দেবী। তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এসে দেখা করায় কেমন লাগছে, তখন তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর ‘খুব ভালো লেগেছে।’ কয়েক দশকের স্মৃতি, কাছের মানুষদের হারিয়ে যাওয়া এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ে বৃদ্ধাশ্রমকে আশ্রয় করে নেওয়া সুমিতা দেবীর এই জীবনকাহিনি যেন মনে করিয়ে দেয়, পরিচিতি বা পারিবারিক গৌরব নয়, শেষ বয়সে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে ওঠে পাশে থাকার মতো কিছু মানুষ।






