তারকাদের জীবনকে বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, ব্যক্তিগত জীবনের ছবিটা অনেক সময়ই ততটা সাজানো থাকে না। পর্দার আলো, মঞ্চের অভিনয়, ব্যস্ত শুটিং সবকিছুর আড়ালে থাকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, মান-অভিমান, দায়িত্ব আর একসঙ্গে পথ চলার গল্প। ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় ও রুমকি চট্টোপাধ্যায়ের দাম্পত্যও যেন সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কে যেমন রয়েছে একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ও শ্রদ্ধা, তেমনই রয়েছে প্রতিদিনের খুনসুটি এবং ঝগড়া। তাঁদের কথাতেই স্পষ্ট, দীর্ঘ সংসার মানেই সবসময় একমত হওয়া নয়, বরং মতের অমিলের মধ্যেও কীভাবে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই হয়তো দীর্ঘ দাম্পত্যের আসল গল্প। ২০২৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারেও তাঁদের ৪৫ বছরের সংসারের প্রেম-ঝগড়ার নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল।
ফাল্গুনী ও রুমকির প্রথম পরিচয়ের সূত্রও ছিল থিয়েটার। ফাল্গুনীর বাবা নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেই পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে তাঁর বেড়ে ওঠা। অন্যদিকে রুমকি নিজের সিদ্ধান্তেই থিয়েটারে এসেছিলেন। রুমকি জানান, তিনি তখন গ্র্যাজুয়েশনে পড়ছেন এবং ফাল্গুনীর নাটকের পরিসরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। ফাল্গুনীর কথায়, রুমকির পড়াশোনা, বিশেষ করে বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ এবং কথা বলার ধরনও তাঁর নজর কেড়েছিল। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কের শুরুটা কোনও হঠাৎ দেখা বা চটজলদি প্রেমের গল্পের মতো নয়, থিয়েটারের পরিবেশে একে অপরকে কাছ থেকে চেনা, কাজের প্রতি আগ্রহ এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি আকর্ষণ থেকেই ধীরে ধীরে সম্পর্ক গভীর হয়েছিল। রুমকির কথাতেও বোঝা যায়, সংসার করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে দায়িত্ববোধের বিষয়টিও তখন থেকেই তাঁর ভাবনায় ছিল।
তবে দীর্ঘ দাম্পত্যের সবচেয়ে মজার দিকটি সম্ভবত তাঁদের ঝগড়া। সাক্ষাৎকারে নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দুজনেই হাসতে হাসতে জানান, তাঁদের সকাল অনেক সময়ই ঝগড়া দিয়ে শুরু হয় এবং সেই ঝগড়া চলতে চলতেই দিন শেষ হয়ে যায়। এমনকি কে আগে কথা বলে বা কে আগে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে সেটা নিয়েও তাঁদের মধ্যে মজার টানাপোড়েন রয়েছে। ফাল্গুনী মজা করে দাবি করেন, ঝগড়ায় তিনি সবসময় জয়ী হন। আবার রুমকি জানান, স্বামীর কাছ থেকে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া, বাইরে কোনও সমস্যায় পড়লে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অনেক কিছু তিনি শিখেছেন। তাঁদের কথার মধ্যে তাই ঝগড়ার প্রসঙ্গ থাকলেও কোথাও তিক্ততা নেই, বরং বহু বছরের পরিচয় থেকে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক খুনসুটিই বারবার সামনে এসেছে। তাঁদের সম্পর্কের এই জায়গাটাই হয়তো দেখিয়ে দেয়, একসঙ্গে এত বছর কাটানোর পর ঝগড়াও কখনও কখনও সম্পর্কেরই একটি ভাষা হয়ে ওঠে।
সংসার সামলানোর ক্ষেত্রেও দুজনের ভূমিকা নিয়ে এসেছে অন্যরকম ছবি। রুমকি জানিয়েছেন, অভিনয়, থিয়েটার এবং অন্যান্য কাজের পাশাপাশি সংসারই তাঁর কাছে সবসময় প্রথম অগ্রাধিকার ছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, বাড়ির দায়িত্ব, শিক্ষকতা এবং অভিনয় সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। নিজের জন্য ঘুরতে যাওয়া বা বিনোদনের সুযোগও অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিলেন। আর এখানেই ফাল্গুনীর সমর্থনের কথা উঠে আসে। তাঁর বক্তব্য, রুমকির মধ্যে সংসারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে ক্ষমতা রয়েছে, সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ। অন্যদিকে রুমকিও স্বীকার করেন, ফাল্গুনী বহু পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে তাঁকে সাহায্য করেছেন। ফলে তাঁদের সম্পর্কের ভিত শুধু ভালোবাসা নয়, একে অপরের কাজ ও দায়িত্বকে বোঝার জায়গাতেও তৈরি।
আরও পড়ুনঃ “হ্যাঁ তুই খেয়েই যা, এখানে তো গিলতেই এসেছিস!” সামান্য পনির খেতে চাওয়ায় রাজবীরকে তনুশ্রীর তীব্র কটা’ক্ষ! ফের খাবার নিয়ে হেন’স্তার অভিযোগ, “বাড়ির খাবার কি ওঁর একার?” “এটা সবার বাড়ি, কে কতটা কী খাবে সেটা আপনি ঠিক করবেন না!” “বারবার এমন খোঁটা, দাদা এবার একটু দেখুন!” তনুশ্রীর বিরুদ্ধে সরব বিগ বসের দর্শকরা!
সবশেষে তাঁদের কথায় যে ছবিটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হল ফাল্গুনী ও রুমকির দাম্পত্য কোনও নিখুঁত রূপকথা নয়, বরং হাসি, ঝগড়া, দায়িত্ব, মতের অমিল এবং পারস্পরিক নির্ভরতায় তৈরি একটি দীর্ঘ বাস্তব জীবন। রুমকি যেমন নিজের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি সংসারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, তেমনই ফাল্গুনীও তাঁর পাশে থেকেছেন। কখনও মতের অমিল হয়েছে, কখনও ঝগড়া হয়েছে, আবার সেই ঝগড়ার মধ্যেই সম্পর্কের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে এসেছে। তাই তাঁদের গল্পে ‘সুখী দাম্পত্য’-এর সংজ্ঞা হয়তো ঝগড়াহীন জীবন নয়, বরং ঝগড়া হলেও একে অপরের পাশে থেকে একই পথে এগিয়ে যাওয়াই দীর্ঘ সম্পর্কের আসল শক্তি।






