“দুটো মেয়ে হয়েছে, ছেলে হয়নি…বর ছেড়ে দিয়েছে” সেনা পরিবারের সন্তান, জন্ম থেকে মায়ের অসম্ভব লড়াই দেখে বড় হয়েছেন অর্পিতা মুখোপাধ্যায়! পর্দার হাসিখুশি চরিত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই কঠিন সংগ্রাম কীভাবে বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন? অভিনেত্রী জানালেন, একা দুই মেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে কী কী ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁর মা’কে?

বিনোদন জগতের তারকাদের পর্দায় হাসিমুখ দেখেই তাঁদের জীবনকে সহজ বলে মনে হয়। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই অনেক সময় লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ লড়াই, পারিবারিক ত্যাগ এবং নানা কঠিন অভিজ্ঞতা। দর্শকের সামনে যাঁরা সবসময় প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টা করেন, তাঁদের ব্যক্তিজীবনের গল্প অনেকটাই আলাদা। এমনই এক অজানা অধ্যায়ের কথা উঠে এল অভিনেত্রী অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের কথায়। নিজের ছোটবেলা, পরিবার, মায়ের সংগ্রাম এবং কেরিয়ার নিয়ে খোলামেলা আড্ডায় তিনি জানালেন এমন কিছু কথা, যা তাঁর পর্দার পরিচিতির বাইরে থাকা জীবনটাকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে।

বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি নাচ তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই আনন্দ শঙ্করের কাছে নাচ শেখার শুরু। পরবর্তীতে গণেশ আচার্য ডান্স অ্যাকাডেমির সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রায় ২০ বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, নাচ তাঁর কাছে অনেকটা অক্সিজেনের মতো। অভিনয় এবং নাচের পাশাপাশি দর্শকদের বিনোদন দিয়ে যাওয়াই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। তবে এই হাসিখুশি, প্রাণবন্ত শিল্পীর জীবনেও রয়েছে বেশ কিছু কঠিন অধ্যায়, যার অনেকটাই জুড়ে রয়েছে তাঁর পরিবার এবং মায়ের লড়াই।

অর্পিতার কথায়, ছোটবেলা থেকেই তাঁদের পরিবারকে নানা ধরনের মন্তব্য এবং পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর বাবা আর্মিতে কর্মরত ছিলেন এবং কাজের কারণে অনেক সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন। ফলে দুই মেয়েকে বড় করার ক্ষেত্রে মাকেই অনেকটা দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। শুধু সংসার সামলানো নয়, মেয়েদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে তাঁদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মায়ের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। এমনকী অভিভাবকদের বৈঠকেও তাঁর মাকে একা যেতে হয়েছে এবং সেখানে শুনতে হয়েছে নানা কটুক্তি। স্বামী তাঁকে ছেড়ে দিয়েছেন, ডিভোর্স দিয়েছেন কিংবা ছেলে না হওয়া নিয়েও তাঁকে কথা শুনতে হয়েছে বলে জানান অভিনেত্রী।

সেনা পরিবারের সেই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি যে তাঁর মায়ের জন্য সহজ ছিল না, অর্পিতার কথাতেই তার ইঙ্গিত মেলে। তবে সেইসব কথাকে সামনে রেখে থেমে যাননি তাঁর মা। অর্পিতা জানান, ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত তিনি এবং তাঁর বোন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করলেও তাঁদের জন্য আলাদা করে কোনও টিউশন রাখেননি মা। যতটা সম্ভব নিজেই মেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন। পরবর্তীতে মেয়েরা কলেজে ওঠার পরও তাঁদের শিক্ষার বিষয়ে সমানভাবে পাশে থেকেছেন। বড় মেয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি করেন।

নিজের জীবনে যে সুযোগগুলো পাননি, মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই অভাব যেন না থাকে এই ভাবনা থেকেই তাঁদের পড়াশোনায় জোর দিয়েছিলেন অর্পিতার মা। অর্পিতার কথায়, তাঁর নিজের পড়াশোনাও একসময় থেমে গিয়েছিল, তাই মেয়েদের নিজেদের পায়ে দাঁড় করানো ছিল তাঁর মায়ের অন্যতম লক্ষ্য। আজ দুই মেয়ের সাফল্য দেখে সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের মূল্য যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের সেই শিক্ষাই নিজের জীবনেও ধরে রেখেছেন অর্পিতা। বিয়ের পরেও কেরিয়ার থামাননি তিনি। ২০১৩ থেকে এখনও পর্যন্ত অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর শাশুড়ি এবং পরিবারের সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

আরও পড়ুনঃ “বাবার পরিচয়ে নয়, নিজের যোগ্যতায় এগোতে শিখিয়েছি, বাকিটা ভাগ্য…” “জয়-পরাজয় জীবনের অঙ্গ, দর্শকদের ভালোবাসা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে সেটাই আসল!” ‘বিগ বস বাংলা’ থেকে এলিমিনেটেড সোহিনী পাল, মুখ খুললেন তাপস-পত্নী নন্দিনী পাল! ২০১৩-তে নিজেও ছিলেন বিগ বসের প্রতিযোগী, সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেয়ের তুলনা টেনে কী জানালেন তিনি? কতটা ভালো খেলেছে, কতটা ভালো আরও হতে পারত?

একইসঙ্গে মেয়েকে নিজের পছন্দের পথে এগিয়ে যেতে দিতে চান তিনি। কোনও নির্দিষ্ট পেশা চাপিয়ে দেওয়ার বদলে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়াকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অর্পিতা। আর এখানেই শেষ নয়, সমাজে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর আবেদন, অন্যায় বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে একা ফেলে রাখা উচিত নয়। সবাই একসঙ্গে প্রতিবাদ করলে তবেই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব এমনই বার্তা দিয়েছেন অভিনেত্রী।

You cannot copy content of this page