মহানায়কের জনপ্রিয়তায় চাপা পড়ে গিয়েছিল তাঁর নাম, অথচ শ্রী রামকৃষ্ণ রূপে দর্শকের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়! চরিত্রে এতটাই ডুবে গিয়েছিল, পর্দায় অভিনয় করতে করতে বদলে যায় তাঁর বাস্তবের শরীরী ভঙ্গিও! স্বর্ণযুগের এই অভিনেতাকে মনে রেখেছেন কতজন? শেষ বয়সে যা হয়, তাঁর অজানা কাহিনি অবাক করবে আপনাকেও!

বিনোদন জগতে এমন অনেক শিল্পী থাকেন, যাঁদের অবদান বাংলা অভিনয়ের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের নাম যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের কথা উঠলেই উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো তারকাদের নাম সবার আগে মনে পড়ে। কিন্তু সেই সময়ের অভিনয় জগতে এমনও বহু শিল্পী ছিলেন, যাঁরা নায়ক-নায়িকার প্রচলিত পরিচয়ের বাইরে গিয়েও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন। তাঁদেরই একজন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে শ্রীরামকৃষ্ণের চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে বাংলা অভিনয় জগতের এক স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিল। আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো তাঁর নাম সেভাবে জানেন না, কিন্তু একসময় তাঁর অভিনীত রামকৃষ্ণ চরিত্রই ছিল দর্শকের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।

মঞ্চ, যাত্রা এবং চলচ্চিত্র তিন ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন কাজ করেছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৪১ সালে ‘বাংলার মেয়ে’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৪৭ সালে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবিতে তাঁকে নায়কের ভূমিকাতেও দেখা যায়। এরপর ‘রামি চণ্ডীদাস’, ‘কুয়াশা’, ‘শাড়ি চুয়ার’, ‘নীলদর্পণ’, ‘সাবিত্রী’, ‘শক্তিবান’, ‘রানী রাসমণি’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। তবে তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় তৈরি হয়েছিল ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। শ্রীরামকৃষ্ণ, রামপ্রসাদ কিংবা বামাক্ষ্যাপার মতো চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় ১৯৪৮ সালের দিকে মঞ্চে ‘যুগাবতার’ নাটকে রামকৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে।

তবে রামকৃষ্ণের মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের চরিত্রে একজন সাধারণ অভিনেতা মঞ্চে অভিনয় করবেন এই বিষয়টি নিয়ে সেই সময় আপত্তি উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত নাটকটি রূপকের আকারে মঞ্চস্থ করা হয় এবং রামকৃষ্ণের চরিত্রের নাম রাখা হয় ‘সচ্চিদানন্দ’। সেই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয় গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আর সেখান থেকেই যেন তাঁর অভিনয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। গুরুদাস শুধু সংলাপ বলা বা বাহ্যিক সাজসজ্জার মধ্যে নিজের অভিনয়কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। চরিত্রের ভাব, শরীরের ভাষা এবং আচরণকে নিজের অভিনয়ের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিতেন যে দর্শকের অনেকের কাছেই মঞ্চে অভিনেতা গুরুদাসকে আর আলাদা করে মনে হতো না।

বরং মনে হতো, তাঁদের সামনে যেন সত্যিই শ্রীরামকৃষ্ণ উপস্থিত হয়েছেন। এই গভীর চরিত্রধারণই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তাঁর শিল্পীজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মলিনা দেবীর সঙ্গে কাজ। ১৯৫৮ সালে দুজনে মিলে তৈরি করেন ‘এমজি ইন্টারপ্রাইজ’। এই নাট্যদলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে ছিল ‘ঠাকুর রামকৃষ্ণ’, ‘রানী রাসমণি’ এবং পরবর্তীতে ‘যুগাবতার’। ‘ঠাকুর রামকৃষ্ণ’-এ গুরুদাস অভিনয় করতেন রামকৃষ্ণের ভূমিকায় এবং মলিনা দেবী অভিনয় করতেন রানী রাসমণির চরিত্রে। কলকাতার পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন শহর, গ্রাম এবং বাংলার বাইরেও তাঁদের নাটক জনপ্রিয় হয়েছিল।

গুরুদাসের অভিনয়ের গভীরতার একটি চমৎকার স্মৃতিও পাওয়া যায় মলিনা দেবীকে ঘিরে একটি স্মৃতিচারণে। বলা হয়, দীর্ঘদিন রামকৃষ্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে করতে কখনও কখনও তাঁর স্বাভাবিক শরীরী ভঙ্গিতেও সেই চরিত্রের প্রভাব পড়ত। একদিন তাঁর আঙুলের বিশেষ একটি মুদ্রা দেখে মলিনা দেবী জানতে চেয়েছিলেন, তিনি এভাবে হাত রেখেছেন কেন। গুরুদাস নাকি উত্তরে বলেছিলেন, তিনি এমনটাই ভেবেছিলেন। ঘটনাটি সত্যিই দেখায়, একজন অভিনেতা যখন চরিত্রকে শুধু মঞ্চে নয়, নিজের ভাবনার মধ্যেও ধারণ করেন, তখন অভিনয় আর শুধুমাত্র পেশা থাকে না। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তাঁর সক্রিয় অভিনয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুনঃ “দয়া করে আমাকে বাঁচান…” চেম্বারে ঢুকতেই বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে কাতর আর্জি উত্তম কুমারের! কীভাবে চরম বিপদে মহানায়ককে উদ্ধার করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা ডাক্তারবাবু? কেনই বা অভিনেতাকে ‘শ্যামল’ ডাকতেন তিনি? দুই ভিন্ন জগতের মানুষের এই মধুর সম্পর্কের নেপথ্যে রয়েছে এমন এক অজানা গল্প, যা মুগ্ধ করবে আপনাকেও!

পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন তথ্য থাকলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রের অভাবে সেগুলিকে বাড়িয়ে বলা ঠিক নয়। কারণ গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তাঁর জীবনে অজানা গল্প জুড়ে দেওয়ায় নয়, বরং তাঁর সত্যিকারের শিল্পকর্মকে মনে রাখায়। জনপ্রিয় নায়ক হওয়ার প্রতিযোগিতার বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস এবং মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চরিত্র। আর সেই কারণেই পর্দায় ও মঞ্চে রামকৃষ্ণ হয়ে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আজও বাংলা অভিনয়ের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র নাম।

You cannot copy content of this page