“এবার দেখুন, একজন নারীর কেমন লাগে?” দৃশ্যধারণ শেষ হতেই ‘রনংদেহী’ মিঠু মুখোপাধ্যায়, পর্দার ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ বাস্তবেও ছিলেন আপসহীন! সেটে প্রযোজকের দ্বারা অপমানিত হয়ে এমন কী করেছিলেন প্রয়াত অভিনেত্রী, যা নারীর আত্মসম্মানের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল? বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আজও আলোচিত সেই সাহসী প্রতিবাদ!

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেত্রী রয়েছেন, যাঁদের অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিত্বও দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। মিঠু মুখোপাধ্যায় (Mithu Mukherjee) ছিলেন তাঁদেরই একজন। সত্তরের দশকে নিজের সৌন্দর্য, প্রাণবন্ত অভিনয় এবং পর্দায় স্বতন্ত্র উপস্থিতির মাধ্যমে দর্শকদের নজর কেড়েছিলেন তিনি। সেই সময় বাংলা ছবির জগতে পুরুষদের প্রভাব ছিল অনেক বেশি। এমন পরিবেশে নিজের সম্মান ও আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই করা অভিনেত্রীদের পক্ষে সহজ ছিল না। কিন্তু মিঠু মুখোপাধ্যায় নিজের জীবনে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী রেখেছিলেন, যা আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আলোচনার বিষয়। শুটিংয়ের সময় অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তিনি যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তা দেখে সেদিন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ছবির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। পর্দায় যেমন শক্তিশালী নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন, বাস্তবেও তেমনই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে পিছপা হননি এই অভিনেত্রী।

মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের শুরু ১৯৭২ সালে চিত্ত বসু পরিচালিত ‘শেষ পর্ব’ ছবির মাধ্যমে। সেই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন শমিত ভঞ্জ। তবে প্রথম ছবিতে তেমন সাফল্য না পেলেও পরের বছর দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘মর্জিনা আবদাল্লা’ তাঁকে পরিচিতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ছবিতে মর্জিনার চরিত্রে তাঁর অভিনয় এবং নজরকাড়া নাচ দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ‘হায় হায় প্রাণ যায়’ গানের সঙ্গে তাঁর নাচও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এরপর ‘নিশিকন্যা’ ছবিতেও অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা পান তিনি। ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মৌচাক’ ছবিতে নীপা চরিত্রে অভিনয় করে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মিঠু। উত্তমকুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এবং রঞ্জিত মল্লিকের মতো শিল্পীদের সঙ্গে একই ছবিতে কাজ করে নিজের অভিনয়ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি।

মিঠুর জনপ্রিয়তা শুধু বাংলা ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হিন্দি সিনেমাতেও কাজ করেছিলেন তিনি। দুলাল গুহ পরিচালিত ‘খান দোস্ত’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন অভিনেত্রী। এরপর ‘দিল্লগি’, ‘সফেদ ঝুট’, ‘দো লড়কে দোনো কড়কে’ এবং ‘মায়া মালহোত্রা’র মতো ছবিতে অভিনয় করেন। তবে মুম্বইয়ের ছবির জগতে তাঁর যাত্রা খুব একটা সহজ হয়নি। পরে কলকাতায় ফিরে ‘সন্ধি’, ‘দু’জনে’, ‘ভাগ্যচক্র’ এবং ‘প্রার্থনা’র মতো ছবিতে কাজ করেন। বাংলা সিনেমার একাধিক জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। উত্তমকুমার থেকে শুরু করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক এবং দেবরাজ রায়ের সঙ্গে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রায় ছয় বছরের বিরতি কাটিয়ে আবার পর্দায় ফেরেন মিঠু। নব্বইয়ের দশকে মুক্তি পাওয়া ‘আশ্রিতা’ ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। ছবিটি সফল হওয়ার পর ধীরে ধীরে অভিনয়জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

তবে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবির শুটিংয়ের সেই ঘটনা। ছবিতে একটি দৃশ্য ছিল, যেখানে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করা অভিজিৎ সেনকে মিঠুর গায়ে চাবুক মারতে হবে। অভিজিৎ ছিলেন বলিউড অভিনেতা অসিত সেনের পুত্র। শুটিংয়ের আগে দৃশ্যটির মহড়া চলার সময় তিনি চাবুক দিয়ে আস্তে করে মারছিলেন। তখন ছবির প্রযোজক তাঁকে আরও জোরে চাবুক মারার নির্দেশ দেন। অভিজিৎ আপত্তি জানিয়ে বলেন, জোরে মারলে মিঠুর সত্যিই আঘাত লাগতে পারে। কিন্তু প্রযোজক নাকি সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আঘাত লাগলেও সমস্যা নেই, পর্দায় দৃশ্যটি ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে হলে আরও জোরে মারতে হবে। এই নির্দেশে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ওই প্রযোজকের হাত ধরেই মিঠু একসময় ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন এবং তাঁর একাধিক ছবিতে নায়িকা হিসেবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র সময় তাঁদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়।

প্রযোজকের নির্দেশ শোনার পর মিঠু প্রথমে কোনও প্রতিবাদ করেননি। কিন্তু দৃশ্যটির শুটিং শেষ হওয়ার পর তিনি অভিজিৎ সেনের কাছ থেকে চাবুকটি চেয়ে নেন। এরপর সেই চাবুক দিয়েই প্রযোজকের দিকে এগিয়ে যান অভিনেত্রী এবং তাঁকে আঘাত করতে শুরু করেন। সেই সময় শুটিং ফ্লোরে উপস্থিত ব্যক্তিরা হতবাক হয়ে যান। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি বলেও জানা যায়। মিঠু নাকি চাবুক মারতে মারতে প্রযোজককে বলেছিলেন, “দেখুন জোরে চাবুক মারলে লাগে কিনা?” তাঁর এই প্রতিবাদে প্রযোজক আর আগের মতো নির্দেশ দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। বেশ কয়েকবার চাবুক মারার পর মিঠু থামেন। শোনা যায়, ঘটনায় প্রযোজক আহতও হয়েছিলেন। একজন অভিনেত্রীকে শুটিংয়ের প্রয়োজনে আঘাত করার নির্দেশ দেওয়ার বিরুদ্ধে মিঠুর এই প্রতিবাদ দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে আলোচনার বিষয় হয়ে ছিল। নিজের সম্মানের প্রশ্নে তিনি যে আপস করতে রাজি ছিলেন না, সেই বার্তাই যেন পৌঁছে দিয়েছিলেন সেদিন।

আরও পড়ুনঃ “তাঁর জন্যই বুম্বাদার কাছে বারবার সিনেমার ক্যাসেট চাইতাম!” ছোটবেলার গোপন ভালোলাগার কথা ফাঁস করলেন অঞ্জন চৌধুরীর কন্যা রীনা চৌধুরী! কোন তারকার সিনেমা দেখে প্রেমে পড়েছিলেন, কার জন্য এমন পাগল ছিলেন অভিনেত্রী?

মিঠু মুখোপাধ্যায়ের এই ঘটনার সঙ্গে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবির শেষ দৃশ্যেরও একটি যোগ রয়েছে। ছবিতে তাঁর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, যিনি মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তির ভূমিকায় ছিলেন। ছবির খলনায়ক অভিজিৎ সেনের চরিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মিঠুর চরিত্রকে চাবুক হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখা যায়। বাস্তবের ঘটনার পর ছবির শেষ দৃশ্যেও এই প্রতিবাদের দৃশ্য রাখা হয়েছিল। পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সেই নারী চরিত্র দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছিল। প্রতিটি প্রদর্শনীতে দৃশ্যটি দর্শকদের হাততালি কুড়িয়েছিল বলেও জানা যায়। অভিনয়জীবন খুব দীর্ঘ না হলেও ‘মর্জিনা আবদাল্লা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ এবং ‘আশ্রিতা’র মতো ছবির মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন মিঠু। জীবনের শেষ দিকে তিনি মুম্বইয়ে নিভৃতে থাকতেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৭১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে পর্দায় এবং বাস্তবে আত্মমর্যাদার জন্য লড়াই করা অভিনেত্রী হিসেবে মিঠু মুখোপাধ্যায়ের নাম বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

You cannot copy content of this page