মহালয়ার শুভক্ষণে যখন চারদিকে দেবী দুর্গার আগমন নিয়ে উন্মাদনা, তখনই সমাজ মাধ্যমে নিজের পোস্টের মাধ্যমে নতুন করে চর্চায় অভিনেত্রী মৌমিতা পণ্ডিত। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নারীদের প্রতি ঘৃণা, কটাক্ষ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, একদিকে দেবী দুর্গাকে শক্তির প্রতীক হিসেবে পুজো করা হয়, অন্যদিকে সমাজ মাধ্যমে কোনও নারীকে অপমান করতে পিছপা হন না অনেকেই। মহালয়ার শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি সেই দ্বিচারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী। সম্প্রতি প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দাবি ঘিরে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন মৌমিতা। সেই ঘটনার পর থেকেই সমাজ মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা মন্তব্য এবং সমালোচনা চলছে। এবার মহালয়ার পোস্টে নারীদের প্রতি এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
মৌমিতা তাঁর পোস্টে সতীদাহ প্রথার প্রসঙ্গ টেনে অতীতের বর্বরতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের ভার্চুয়াল ট্রোলিংয়ের তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একসময় নারীদের সতীদাহের আগুনে পুড়তে হত, আর আজও কোনও না কোনও নারীকে প্রতিদিন সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সময় বদলেছে, সমাজ এগিয়েছে, কিন্তু নারীদের হেনস্থা করার মানসিকতা কি সত্যিই বদলেছে? এই প্রশ্নই যেন উঠে এসেছে অভিনেত্রীর লেখায়। তাঁর মতে, আগে নারীদের যন্ত্রণার সময় যাঁরা পাশে দাঁড়ানোর বদলে উল্লাস করতেন, আজও তাঁদেরই অন্য একটি রূপ দেখা যায় ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। কোনও নারীকে নিয়ে কটূক্তি করা, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করা কিংবা তাঁকে অপমান করে সেই মন্তব্য অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও সেই মানসিকতার প্রকাশ ঘটে বলে মনে করছেন তিনি। তাই মহালয়ার মতো একটি বিশেষ দিনে দাঁড়িয়ে সমাজের এই দিকটি নিয়ে সকলকে ভাবতে বলেছেন অভিনেত্রী।
নিজের পোস্টে মৌমিতা লিখেছেন, “#অ শুভ মহালয়া !! Metaphor টা হলো, এখানে ১৮০০ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হলেও ভার্চুয়াল ট্রোল এর ঘেন্নার আগুনে পুড়ছে প্রতিদিন কোনো এক নারী এবং তখন ঢাক ঢোল বাজিয়ে পাশে যারা উল্লাস করত তারাও আজও আছে, মধ্যযুগীয় বর্বরতা এযুগে ভার্চুয়াল ঘেন্না share করে কমেন্ট করে তারা ওই ভূমিকায় জ্বলজ্বল করছে।” এই কথার মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, নারীদের প্রতি অত্যাচারের ধরন বদলালেও তাঁদের অপমান করে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা এখনও রয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে সমাজ মাধ্যমে কোনও নারীকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সেখানে একের পর এক কটাক্ষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিদ্রূপের মন্তব্য দেখা যায়। অনেক সময় সেই মন্তব্যের প্রভাব যে সংশ্লিষ্ট মানুষের মানসিক অবস্থার উপর পড়তে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মৌমিতার বক্তব্যে সেই বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, ভার্চুয়াল জগতে বসে কাউকে আক্রমণ করা সহজ হলেও তার আড়ালে থাকা মানুষটির কষ্টের কথা অনেকেই ভাবেন না।
পোস্টের পরের অংশে অভিনেত্রী দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশ্বাস এবং বাস্তব জীবনে মানুষের আচরণের মধ্যে থাকা পার্থক্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “কাজেই মা আসছে আসুক, তবে শুধু মূর্তিতে অসুর বধ করতে নয়, মন এর অসুর গুলোর নিধন করতে এসো মা গো।” দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে বাঙালির আবেগ, বিশ্বাস এবং উৎসবের আনন্দের সঙ্গে এই বার্তাকে জুড়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, পুজোর সময় শুধু প্রতিমার সামনে মাথা নত করলেই হবে না, মানুষের মনের মধ্যে থাকা হিংসা, ঘৃণা এবং অন্যকে ছোট করার প্রবণতার বিরুদ্ধেও লড়াই করা প্রয়োজন। সমাজ মাধ্যমে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কটাক্ষ করার আগে নিজের আচরণ নিয়ে ভাবার কথাও যেন মনে করিয়ে দিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর কাছে মহালয়ার তাৎপর্য তাই শুধু উৎসবের সূচনা নয়, বরং মানুষের মনের অন্ধকার দূর করার প্রার্থনাও।
মৌমিতা আরও লিখেছেন, “যারা মা রূপে তোমাকে প্রণাম করে তারাই আবার আর একজন মেয়ে কে গলাগলি ভর্ৎসনা করে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়, তাদের তুমি ক্ষমা করবে না কথা দিয়ে তবেই এসো।” এই বক্তব্যে দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি নারীদের প্রতি সমাজের আচরণ নিয়ে তাঁর ক্ষোভ স্পষ্ট। যে মানুষ দেবীকে মাতৃরূপে পুজো করেন, তাঁরাই কীভাবে অন্য একজন নারীকে অপমান করতে পারেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী। তবে তাঁর এই পোস্টকে বুঝতে গেলে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রসঙ্গও উঠে আসে। প্রয়াত রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে আনার পর থেকেই মৌমিতাকে নিয়ে বিনোদন জগতে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিনেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ করে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেছিলেন তিনি। এরপর অভিনেত্রী মানসী সিনহা, সুদীপ্তা চক্রবর্তী-সহ কয়েকজন শিল্পী তাঁর পোস্টের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রয়াত অভিনেতার পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের উপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আরও পড়ুনঃ যাঁর ভয়ংকর অট্টহাসি কয়েক প্রজন্মের মহালয়ার স্মৃতিতে আজও অমলিন, পর্দার সেই ‘মহিষাসুর’ অমলকুমার চৌধুরীর বাস্তবের পরিণতি হয়েছিল আরও ম’র্মান্তিক! শেষ জীবনে ঠিকমতো খাবারও জোটেনি দু’বেলা! চরম অসুস্থতা কেটেছে দিন, একাকিত্বেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ! বাঙালির সেই প্রিয় ‘অমল অসুর’-এর য’ন্ত্রণার জীবন কাহিনি চোখে আনবে জল!
পরবর্তী সময়েও রাহুলকে নিয়ে মৌমিতার একাধিক পোস্ট সমাজমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর অভিনেতা তাঁকে নিজের সেরা রূপ হয়ে ওঠার কথা বলেছিলেন বলে উল্লেখ করে আরও একটি পোস্ট করেন তিনি। সেই পোস্টের পরেও তাঁকে ঘিরে সমালোচনা দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে মহালয়ার দিন নারীদের প্রতি ভার্চুয়াল ঘৃণা ও ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে তাঁর বার্তাকে অনেকে সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটেও দেখতে পারেন। যদিও এবারের পোস্টে তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেননি, বরং বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার দিকেই নজর দিয়েছেন। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে, কোনও ব্যক্তিকে পছন্দ না হলেও তাঁকে অপমান করা কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কটাক্ষ করাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। মহালয়ার আবহে তাই দেবী দুর্গার কাছে শুধু অসুর বধের প্রার্থনা নয়, মানুষের মনের মধ্যে থাকা ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতা দূর করার আবেদন জানিয়েছেন মৌমিতা পণ্ডিত।






