উত্তর কলকাতার পাইকপাড়ায় কেটেছে অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদারের শৈশব। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতাতেও তাঁর বাসস্থান রয়েছে। তবে ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার দিনগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উত্তর কলকাতার অলিগলি, পাড়ার মাঠ এবং সেখানকার পুজোর পরিবেশ। গলির শেষ প্রান্তে থাকা ছোট্ট মাঠটিতে যেমন খেলাধুলো চলত, তেমনই সেখানে আয়োজন করা হতো দুর্গাপুজোর। পাড়ার মানুষের একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া থেকে শুরু করে উৎসবের প্রস্তুতি, সবকিছুর মধ্যেই ছিল পরিচিত এক পারিবারিক আবহ। দেবশঙ্করদের পরিবারও ছিল বেশ বড়। চার ভাই, এক বোন, মা-বাবা ছাড়াও আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের যাতায়াত লেগেই থাকত বাড়িতে। তাঁর স্মৃতিতে মা ছিলেন অসাধারণ অতিথিপরায়ণ। পুজোর দিনগুলিতে কী রান্না হবে, কীভাবে পরিবারের সকলে আনন্দে সময় কাটাবেন, তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখতেন তিনি। মহালয়ার আগেই বাড়িঘর পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়ে যেত। ফলে পুজোর আনন্দ যেন শুরু হয়ে যেত উৎসবের মূল দিনগুলি আসার অনেক আগেই।
ছোটবেলার পুজোয় নতুন জামাকাপড় কেনার অভিজ্ঞতাও আজও স্পষ্ট মনে রয়েছে অভিনেতার। চার ভাইয়ের জন্য পোশাক কেনা ছিল পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট দিনে বাবা অভয় হালদার চার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন বড়বাজারে। সেখানে বড় থান থেকে পছন্দের কাপড় কেনা হতো। তারপর সেই কাপড় নিয়ে সোজা দর্জির দোকানে গিয়ে জামা তৈরির জন্য মাপ দেওয়া ছিল নিয়ম। তবে চার ভাইয়ের পোশাক আলাদা রঙের হতো না। একই রঙের জামা পরেই পুজোর দিনগুলিতে ঘুরে বেড়াতেন তাঁরা। পোশাক কেনার দিনেই জুতোও কেনা হয়ে যেত। সেই সময় পুজোর সঙ্গে যাত্রাপালারও গভীর সম্পর্ক ছিল। দেবশঙ্করের বাবা অভয় হালদার ছিলেন জনপ্রিয় ও ব্যস্ত অভিনেতা। যাত্রার জন্য ডাক এলেই তাঁকে অনেক সময় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হতো। ফলে পুজোর দিনগুলিতে বাবাকে পাশে না পেলে মন খারাপ হতো ছেলেদের। উৎসবের আনন্দের মধ্যেও বাবার অনুপস্থিতি যে ছোটদের মনে অভাব তৈরি করত, সেই স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন দেবশঙ্কর। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের কথা মনে করলে পরিবারের সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলিই যেন আরও বেশি করে মনে পড়ে তাঁর।
বাবার ব্যস্ততার কারণে পুজোয় মন খারাপ হলে কয়েক দিনের জন্য বহরমপুরে মামারবাড়িতে চলে যেতেন দেবশঙ্কর ও তাঁর ভাইবোনেরা। গ্রামের পুজোর পরিবেশ ছিল তাঁদের কাছে এক অন্য রকম আনন্দের জায়গা। মামারবাড়িতে পৌঁছনোর খবর পেলেই ছোটদের মনে শুরু হয়ে যেত উৎসবের দিন গোনার পালা। সেখানে ছিল আত্মীয়দের আদর, যত্ন, প্রশ্রয় এবং নিজেদের মতো করে সময় কাটানোর স্বাধীনতা। ছোটবেলার সেই দিনগুলিকে তাঁর কাছে যেন সবকিছু পাওয়ার আনন্দে ভরা এক জগৎ বলে মনে হয়। মামা নিজেই তাঁদের নিতে আসতেন। ফলে যাত্রার প্রস্তুতি থেকেই আনন্দ শুরু হয়ে যেত। কখনও কখনও পুজোর বিসর্জনের দিন বিকেলের দিকে মামারবাড়িতে পৌঁছতেন তাঁরা। তখন গোটা গ্রাম জুড়ে বেরোত বিসর্জনের শোভাযাত্রা। সেই দৃশ্য আজও তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। গ্রামের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের আন্তরিকতা, একসঙ্গে উৎসবে অংশ নেওয়া এবং চারপাশের পরিচিত পরিবেশ ছোটবেলার সেই দিনগুলিকে বিশেষ করে তুলেছিল। সময় পেরিয়ে গেলেও বহরমপুরের মামারবাড়িতে কাটানো পুজোর স্মৃতি তাঁর মনে আলাদা জায়গা দখল করে রয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও বাড়তে থাকে দেবশঙ্করের। তখন শুধু পাইকপাড়ার পুজোয় সময় কাটানো নয়, কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়তেন তিনি। তবে পুজোর আনন্দের সঙ্গে থিয়েটার দেখাও ছিল তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠাকুর দেখা এবং থিয়েটার উপভোগ করা, এই দুইয়ের সমন্বয়েই যেন উৎসব সম্পূর্ণ হতো। পরবর্তী সময়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় তাঁর মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গেও সামান্যভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। সেই সময় থেকেই পুজোয় নতুন জামাকাপড় পরার আনন্দের পাশাপাশি অন্যদের কথা ভাবার বিষয়টি তাঁকে ভাবাতে শুরু করে। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত, পুজোর সময় যদি সকলের নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে শুধু নিজের আনন্দ নিয়েই ব্যস্ত থাকা কতটা ঠিক? এই ভাবনা থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দুঃস্থ মানুষদের সাহায্য করার উদ্যোগ নিতেন তিনি। পুজোর আনন্দ যেন সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, সেই চেষ্টাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। সময়ের সঙ্গে জীবনের নানা ব্যস্ততা বাড়লেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই অভ্যাস আজও বজায় রেখেছেন অভিনেতা। সম্প্রতি মহালয়ার ভোরে বারুইপুরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি, যাতে কিছু মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায়।
আরও পড়ুনঃ “দুর্নিবার ক্যাপ্টেন হতেই গায়ে জ্বা*লা করছে নাকি?” “নিরঞ্জনের সময় তো এমন প্রতিবাদ করেননি!” বিগ বসের ঘরে মোনামীকে আ’ঘাতের পর, গায়কের বিছানায় জল ঢেলে নতুন বিতর্কে জিতু কমল! ‘ভণ্ড শিবভক্ত, সা*ইকো কোথাকার’ নেটপাড়ায় তকমা অভিনেতাকে, আচরণ নিয়ে ক্ষু’ব্ধ রাজবীর সহ প্রতিযোগীদের একাংশও!
বছরের অধিকাংশ সময় অভিনয় ও অন্যান্য কাজের ব্যস্ততায় কাটলেও দুর্গাপুজোর সঙ্গে দেবশঙ্করের সম্পর্ক আজও গভীর। ছোটবেলার মতো আগের দিনগুলিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব না হলেও উৎসবের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন তিনি। গত প্রায় ২০ বছর ধরে অষ্টমী অথবা নবমীর দিন পরিবারকে নিয়ে সোদপুরের এক পরিচিতের বাড়িতে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে তাঁর। সেখানে সারাদিন ধরে চলে আড্ডা ও খাওয়াদাওয়া। কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যে এই সময়টুকু তাঁকে স্বস্তি দেয়, মনকে করে তোলে ফুরফুরে। পুজোর সেই দিনটি কাটিয়ে আবার পরের বছরের অপেক্ষা শুরু হয়। ছোটবেলায় পাইকপাড়ার গলি, চার ভাইয়ের একই রঙের জামা, বাবার সঙ্গে বড়বাজারে কেনাকাটা এবং বহরমপুরের মামারবাড়ির আনন্দ, সব মিলিয়ে তাঁর দুর্গাপুজোর স্মৃতি তৈরি হয়েছে নানা অভিজ্ঞতায়। পরবর্তী সময়ে সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখা, থিয়েটার উপভোগ করা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের ভাবনা। ফলে তাঁর কাছে দুর্গাপুজো কেবল আনন্দ বা পারিবারিক মিলনমেলার উৎসব নয়, অন্য মানুষের কথা মনে রাখারও সময়। পুজোর আনন্দে যাতে দুঃস্থ মানুষদের কথা ভুলে না যাওয়া হয়, সেই বার্তাই নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন দেবশঙ্কর হালদার।






