দুর্গাপুজো মানেই ছোটবেলার নানা স্মৃতি, নতুন জামাকাপড়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর পাড়ার মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো। সময়ের সঙ্গে পুজো উদযাপনের ধরন বদলালেও শৈশবের সেই দিনগুলির স্মৃতি অনেকের মনেই রয়ে যায়। সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবণী সেনের কাছেও দুর্গাপুজো মানে এমনই কিছু আনন্দের মুহূর্ত, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি, পাড়ার উৎসব এবং বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়। দক্ষিণ কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা শ্রাবণীর ছোটবেলার পুজো কাটত মূলত নিজের পাড়াতেই। নতুন জামা পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা, দল বেঁধে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে পুজোর দিনগুলির জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকতেন তিনি। তবে সেই আনন্দের মধ্যেই একবার এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও ভুলতে পারেননি শিল্পী। পুজোর ঠিক আগে তাঁদের পরিবারের সমস্ত নতুন জামাকাপড় চুরি হয়ে যাওয়ায় কার্যত মাথায় হাত পড়েছিল তাঁর মায়ের।
শ্রাবণীর স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট সেই ঘটনার কথা। তাঁদের বাড়ির কাছেই ছিল একটি পরিচিত দর্জির দোকান, যেখান থেকে পরিবারের প্রত্যেকের জামাকাপড় তৈরি করা হতো। পুজোর আগে পঞ্চমী কিংবা ষষ্ঠীর সময় হঠাৎ বাড়িতে এসে তাঁর মা জানতে পারেন, সেই দোকানে চুরি হয়েছে। শুধু তাঁদের পরিবারের পোশাক নয়, দোকানের সব জামাকাপড়ই চুরি হয়ে গিয়েছিল বলে জানান তিনি। বাড়িতে ফিরে উদ্বিগ্ন হয়ে মা যখন সেই খবর দেন, তখন ছোট্ট শ্রাবণীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। একদিকে পছন্দের নতুন পোশাক পরার স্বপ্ন, অন্যদিকে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোনোর পরিকল্পনা, সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। পুজোর আনন্দের ঠিক মুখে এমন ঘটনা ঘটবে, তা কেউই ভাবতে পারেননি। নতুন জামাকাপড় ছাড়া কীভাবে পুজো কাটবে, সেই চিন্তায় মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল শ্রাবণীরও।
পরিস্থিতি বুঝে আর দেরি করেননি শ্রাবণীর মা। তিনি সোজা থানায় গিয়ে পুলিশের সাহায্য চান। সেই সময় থানার দায়িত্বে থাকা আধিকারিক বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখেন এবং জামাকাপড় উদ্ধার করার আশ্বাস দেন। তিনি এক দিন সময় চেয়েছিলেন বলে স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন শ্রাবণী। তবে ছোট্ট শ্রাবণীর মনে হয়েছিল, হয়তো তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই এমন কথা বলছেন ওই পুলিশ আধিকারিক। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক উল্টোটা। পুলিশ দ্রুত তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত শুরু করে এবং গোটা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে চুরি যাওয়া জামাকাপড় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। আশ্চর্যের বিষয়, ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সমস্ত পোশাক ফিরে আসে। শ্রাবণীর কাছে ঘটনাটি ছিল অবিশ্বাস্য। যে নতুন জামাকাপড়ের জন্য তাঁদের পুজোর আনন্দ কার্যত মাটি হতে বসেছিল, সেগুলি আবার ফিরে পাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছিল পরিবারে। সেই পুলিশ আধিকারিককে আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন শিল্পী।
পরে শ্রাবণী যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন তাঁদের পরিবার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে চলে আসে। সেই থেকে ওই এলাকাতেই তাঁদের বসবাস। নতুন আবাসনে প্রথম দুর্গাপুজোর স্মৃতিও আজও মনে রেখেছেন তিনি। সেই সময় তাঁর মা পুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন। অনুষ্ঠানে নাচ ও গীতিনাট্যের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে অংশ নিয়েছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ও। শ্রাবণী অবশ্য ছোটবেলা থেকেই প্রতিদিন ঠাকুর দেখতে বেরোতেন না। বরং দু-এক দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দল বেঁধে বেছে বেছে কয়েকটি মণ্ডপে যেতেন। মায়ের আবার ঠাকুর দেখার প্রতি ছিল বিশেষ টান। পুজোর দিনগুলিতে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করতে ভালোবাসতেন তিনি। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর শ্রাবণীর নিজেরও আর আগের মতো বাইরে বেরিয়ে ঠাকুর দেখতে ইচ্ছে করত না। যে পুজো একসময় মায়ের সঙ্গে ঘোরাঘুরি আর আনন্দে ভরে থাকত, সেই উৎসবের সঙ্গেই ধীরে ধীরে জড়িয়ে যায় প্রিয়জনকে হারানোর শূন্যতা।
আরও পড়ুনঃ ‘আমারও ভালো লাগেনি নাচটা, কিন্তু দোষ কোরিওগ্রাফারের, ঋতুপর্ণার না!’ ‘ঋতু খুব বড় মনের মেয়ে, কী যে ভালো এরকম কেউ হয়ই না’ মহালয়ার অনুষ্ঠানে লাল শাড়িতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর নাচ নিয়ে বিত’র্কে মুখ খুললেন ইন্দ্রাণী হালদার, সহ অভিনেত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে রাখলেন স্পষ্ট মত! ‘না না, আপনারা সব ধোঁয়া তুলসী পাতা’ হলেন ট্রো’ল!
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রাবণীর পুজো কাটানোর ধরনও বদলে যায়। বড় হওয়ার পর বাইরে ঘোরাঘুরি কমিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বরং ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বাড়ির পুজোতেই আড্ডা দিয়ে রাত কাটাতেন। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে গান গাওয়ার মধ্যেও খুঁজে পেতেন উৎসবের আনন্দ। পরে গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর কাজের সূত্রে অনেক সময় দুর্গাপুজোয় কলকাতার বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। কখনও অনুষ্ঠানের জন্য বিদেশেও যেতে হয়েছে। তবু দশমীতে কলকাতায় ফিরতে পারলে কয়েকটি মণ্ডপে ঠাকুর দেখা তাঁর তালিকায় থাকতই। বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজো ছিল সেই পছন্দের তালিকার অন্যতম। বিদেশে বা শহরের বাইরে থাকলে কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও মন পড়ে থাকত কলকাতার পুজোয়। এ বছর অবশ্য শহর ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেন না শ্রাবণী। কলকাতাতেই রয়েছেন তিনি। ছোটবেলার নতুন জামাকাপড় চুরির অবিশ্বাস্য ঘটনা থেকে শুরু করে মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার স্মৃতি, সব মিলিয়ে শ্রাবণীর কাছে দুর্গাপুজো আজও জীবনের নানা অনুভূতি আর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ সময়।






