উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা শহরে। ঠাকুর দেখতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন দর্শনার্থী, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। উৎসবের আনন্দের মধ্যেই এমন মর্মান্তিক ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখ। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দেবলীনা দত্ত, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, স্বস্তিকা দত্ত এবং বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সকলেই এই ঘটনায় নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁদের কথায় উঠে এসেছে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা, আহতদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার প্রার্থনা এবং এমন ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি। একইসঙ্গে দুর্ঘটনার পরেও বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে গানবাজনা ও মাইক চলতে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন অভিনেত্রী। তাঁদের বক্তব্য, এত মানুষের প্রাণহানির পর উৎসবের পরিবেশে কিছুটা সংবেদনশীলতা থাকা প্রয়োজন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সামাজিক মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি লেখেন, “চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। উৎসবের আনন্দের মুহূর্ত এমন বিষাদে ঢেকে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারছি না। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি আমার গভীরতম সমবেদনা জানাচ্ছি। যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।” তাঁর এই বক্তব্যে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষগুলির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহতদের সুস্থ হয়ে ওঠার কামনাও প্রকাশ পেয়েছে। দুর্গাপুজোর মতো আনন্দের উৎসবে এমন বিপর্যয় যে কতটা কষ্টের, সেই কথাও উঠে এসেছে তাঁর প্রতিক্রিয়ায়। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার কারণ এবং ভিড় সামলানোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন প্রশাসন ও পুজো উদ্যোক্তাদের ভূমিকা নিয়েও সরব হয়েছেন বিনোদন জগতের কয়েকজন পরিচিত মুখ।
চোরবাগানের ঘটনায় প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেত্রী বিদীপ্তা চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য, এমন অবহেলা ও গাফিলতির ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিনেত্রী স্বস্তিকা দত্তও সামাজিক মাধ্যমে নিজের ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তিনি লেখেন, “নজর লাগলো, তাই? সবই কি পাসের খেলা ভাই? মা, মানলেন না এ মহাবরণ। ভেঙে গেল দোকানটি, মিলিয়ে গেল উৎসবটি…” তাঁর এই কথায় উৎসবের আবহের মধ্যে আচমকা নেমে আসা বিপর্যয়ের যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে। যে সময়ে শহরজুড়ে মানুষ আনন্দ করে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছেন, সেই সময়েই এতগুলি প্রাণ চলে যাওয়ার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। দুর্ঘটনার পর দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে দুর্ঘটনার পরেও পুজোমণ্ডপে মাইক ও গানবাজনা চলতে থাকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, “১৭ টা প্রাণ। ১৭ টা পরিবারের হাহাকার। উৎসব জারি……. মাইকগুলো বন্ধ করা যায় না একটু?” ঘটনার সময় প্রাথমিকভাবে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯। দেবলীনার বক্তব্যে উঠে এসেছে, এতগুলি পরিবারের জীবনে যখন শোক নেমে এসেছে, তখন শহরের উৎসবের পরিবেশে কিছুটা সংযম দেখানো উচিত। তাঁর প্রশ্ন, এমন ভয়াবহ ঘটনার পরেও কি কিছুক্ষণের জন্য মাইক বন্ধ রাখা সম্ভব নয়? দুর্ঘটনার পর শহরের বিভিন্ন জায়গায় উৎসবের আয়োজন চলতে থাকায় এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রতিক্রিয়া ঘিরে মূলত মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনার পর সামাজিকভাবে কী ধরনের আচরণ করা উচিত, সেই বিষয়টিই সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন: “অনেকেই ভাবছেন আমার ক্যা*ন্সার হয়েছে!” “ব্যক্তিগত কথার ফুটেজ নিয়ে মানুষকে ভুল বার্তা দিচ্ছে, তিলকে তাল করলে ফল ভুগতে হবে!” দেড় বছর ভুগেছেন ভয়ঙ্কর গলার অসুখে? রীতিমতো ক্ষু’ব্ধ জয়তী চক্রবর্তী, কাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি? আসলেই কি হয়েছিল গায়িকার সঙ্গে, এখন কেমন আছে?
একই সুর শোনা গিয়েছে অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তীর কথাতেও। চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর পুজোমণ্ডপে গানবাজনা বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়েছেন তিনিও। সুদীপ্তা লিখেছেন, “আপনার শহরে ১৭ জন একসঙ্গে মৃত… ঠাকুর দেখতে গিয়ে। এক্ষুণি একটি ৭ বছরের শিশুরও প্রাণ গেছে। হাহাকার করছে অনেকগুলো মানুষ… আপনার শহরে। হাসপাতালে লড়ছে আরও অনেকজন। দয়া করে প্যান্ডেলে গান-বাজনাগুলো খানিক্ষণের জন্য বন্ধ করা যায় না?” তাঁর বক্তব্যে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষের পাশাপাশি আহতদের অবস্থার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে একটি শিশুর মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি শহরের মানুষের কাছে কিছুক্ষণের জন্য হলেও উৎসবের শব্দ কমানোর আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যখন বহু পরিবার প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকের মধ্যে রয়েছে এবং হাসপাতালে আহতরা চিকিৎসাধীন, তখন অন্তত সাময়িকভাবে গানবাজনা বন্ধ রাখা উচিত।
সব মিলিয়ে চোরবাগান দুর্ঘটনা ঘিরে টলিউডের একাধিক শিল্পীর প্রতিক্রিয়ায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার কামনা, অন্যদিকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় শোকপ্রকাশ করেছেন, স্বস্তিকা দত্ত নিজের আক্ষেপ জানিয়েছেন, আর বিদীপ্তা চক্রবর্তী প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ তুলে শাস্তির দাবি করেছেন। দেবলীনা দত্ত ও সুদীপ্তা চক্রবর্তী আবার প্রাণহানির পরেও পুজোমণ্ডপে মাইক ও গানবাজনা চলতে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্যে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি মানুষের দুঃখ ও বিপদের সময় সংবেদনশীল থাকার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু কলকাতার পুজোর নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, বিপর্যয়ের মুহূর্তে সমাজের দায়িত্ববোধ এবং অন্যের শোকের প্রতি সম্মান দেখানোর বিষয়টিও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।






