বিনোদন জগতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা আলো ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে শিল্পীদের অন্ধকার জীবনের সাক্ষী হয়ে থাকে। পর্দায় যাঁদের হাসিমুখে দর্শক আনন্দ পান, বাস্তব জীবনে তাঁদের অনেককেই লড়াই করতে হয় নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে। কারও জীবনে আসে প্রেম, কারও জীবনে বিচ্ছেদ, আবার কেউ হারিয়ে যান অকালে। বাংলা চলচ্চিত্র জগতেও এমনই এক অভিনেত্রী ছিলেন রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী। একসময় টলিপাড়ায় নিজের অভিনয় দিয়ে নজর কেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সাফল্যের সেই পথ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা আর গুরুতর অসুস্থতা শেষ পর্যন্ত থামিয়ে দিয়েছিল তাঁর পথচলা। আজও তাঁর জীবনকাহিনি মনে করিয়ে দেয়, পর্দার ঝলমলে আলোর আড়ালে কত না বলা গল্প লুকিয়ে থাকে।
রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী ছিলেন বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা কবিতা সিংহের মেয়ে। তাঁর বাবা বিমল রায়চৌধুরীও ছিলেন লেখক। ছোট বোনের নাম পরমেশ্বরী। ঠোঁটের উপরে বড় একটি তিল ছিল রাজেশ্বরীর অন্যতম পরিচয়। অভিনয়ে আসার আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করলেও শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে পা রাখেন চলচ্চিত্র জগতে। ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্ত্রীর পত্র ছবিতে অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বাংলা ছবির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন রাজেশ্বরী। ১৯৮৬ সালে ডাক্তার বউ ছবিতে অভিনয়ের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। এরপর রাজপুরুষ, দোলনচাঁপা, রাজনটকী, আগুন, শক্তি, দাবার চাল, সিঁথির সিঁদুর এবং শত্রুপক্ষ–সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি রাজেশ্বরীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও সেই সময় টলিপাড়ায় কম চর্চা হয়নি। শোনা যায়, কাজ করতে করতেই তৎকালীন সুদর্শন অভিনেতা অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। অভিষেকের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন রাজেশ্বরী। তবে তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। একসময় দুজনে লিভ ইন সম্পর্কে থাকতে শুরু করেন। সেই সময়ের বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাঁদের এই সম্পর্ক যথেষ্ট আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। পর্দার বাইরেও তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আগ্রহ ছিল অনুরাগীদের। কিন্তু সম্পর্কের শুরুটা যতই সুন্দর হোক, শেষ পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়নি। কথিত আছে, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর একসঙ্গে থাকার পর আলাদা হয়ে যান রাজেশ্বরী ও অভিষেক। তাঁদের বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে নানা কথা শোনা গেলেও, ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রকৃত সমীকরণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।
আরও পড়ুন: “রাজবীর খুব সরল, বোকাও আছে, হঠাৎ রেগে যায়!” রাজবীরের সমর্থনে মুখ খুললেন দিব্যজ্যোতি দত্ত! বিগ বসে ডাক পেয়েও কেন গেলেন না অভিনেতা? খেলায় নিজেকে অযোগ্য মনে করেন তিনি, নাকি রয়েছে অন্য কোনও কারণ?
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর রাজেশ্বরী মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেছিলেন বলে শোনা যায়। তবে তাঁর জীবনের সেই কঠিন সময় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যেও অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৯৪ সালের দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন অভিনেত্রী। জানা যায়, সেই সময় জীবন সন্ধান নামে একটি বাংলা ছবির শুটিং করছিলেন তিনি। তখনই হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হওয়ার খবর সামনে আসে। চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ১৯৯৪ সালেই মাত্র অল্প বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানান রাজেশ্বরী। তাঁর এই অকালপ্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্র জগতের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। যে অভিনেত্রী একসময় নিজের অভিনয় ও স্বতন্ত্র চেহারার জন্য দর্শকদের নজর কেড়েছিলেন, তাঁর জীবন থেমে যায় সাফল্যের পথেই।
আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই রাজেশ্বরী রায়চৌধুরীর নাম হয়তো খুব একটা পরিচিত নয়। কিন্তু যাঁরা তাঁর অভিনয় দেখেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে এখনও রয়ে গিয়েছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর জীবন একদিকে যেমন বাংলা সিনেমায় তাঁর অবদানের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনই অন্যদিকে সামনে আনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অসুস্থতার কঠিন বাস্তবতাকে। অল্প সময়ের অভিনয়জীবনেও দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। সময়ের সঙ্গে অনেক তারকার নাম বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়, কিন্তু তাঁদের কাজ বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। রাজেশ্বরীও তেমনই এক অভিনেত্রী, যাঁর জীবনকাহিনি আজও কৌতূহল জাগায়। তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা।






