“সন্তানদের ভালো হলে বলা হয় মায়ের মতো, খারাপ হলে বাবার মতোই হয়েছে!” “দিনের শেষে সব বাবারাই সিঙ্গল ফাদার, সমাজ আমাদের খাওয়ায় না…” এত দিনের বিয়ে ভাঙার পর ডুবে যান অবসা’দে, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা পেরিয়ে এবার দুর্গাপুজোয় স্বস্তির নিঃশ্বাস! ছেলে যশোজিৎকে নিয়ে নতুন করে ভালো থাকার স্বপ্ন দেখছেন জয়জিৎ?

বাংলা টেলিভিশন ও সিনেমার পরিচিত মুখ জয়জিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জীবন গত কয়েক বছরে নানা ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে বিচ্ছেদ, কাজের অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপের মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে অভিনেতাকে। তবে এই সবকিছুর মধ্যেও নিজের কাজ এবং পরিবারকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। সম্প্রতি আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক নিয়ে মুখ খুলেছেন জয়জিৎ। সেখানে উঠে এসেছে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ, ছেলে যশোজিৎকে বড় করে তোলা এবং একা বাবা হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর কথা। একই সঙ্গে সমাজের চোখে বিচ্ছেদ এবং সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর মতে, সম্পর্কের ওঠাপড়া জীবনের অংশ হলেও তা দিয়ে একজন মানুষের গোটা জীবনকে বিচার করা উচিত নয়।

জয়জিৎ ও তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী শ্রেয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে যশোজিৎ এখন প্রেসিডেন্সি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছেলেকে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে নিজের বাবা-মায়ের অবদানের কথা বারবার স্বীকার করেছেন অভিনেতা। তিনি জানিয়েছেন, তিনি এবং শ্রেয়া দুজনেই কাজের ব্যস্ততায় দিনের অনেকটা সময় কাটাতেন। সেই কারণে ছোটবেলা থেকেই যশোজিৎ মূলত তার ঠাকুরদা ও ঠাকুমার কাছেই বড় হয়েছে। তাই ছেলের মানুষ হয়ে ওঠার পুরো কৃতিত্ব নিজের বলে মনে করেন না জয়জিৎ। তাঁর কথায়, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের প্রভাব সন্তানের মনে পড়তেই পারে, সেই বিষয়টি অস্বীকার করার জায়গা নেই। ছেলের সঙ্গে তাই শুধু বাবা হিসেবে নয়, বন্ধুর মতো মিশতে চান তিনি। যাতে যশোজিৎ কোনও কথা বলতে বা নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে দ্বিধা না করে, সেই চেষ্টাই করেন অভিনেতা।

এ বারের পুজো কীভাবে কাটাচ্ছেন, সেই প্রসঙ্গেও নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন জয়জিৎ। অভিনেতার কথায়, যশোজিৎ বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে এবং সে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতেই পছন্দ করে। ছেলের নিজের মতো করে সময় কাটানোর স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেন তিনি। যশোজিতের বিশেষ কোনও চাহিদা নেই বলেও জানিয়েছেন জয়জিৎ। তাঁর ছেলে সাধারণত পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেই পছন্দ করে। তাই অভিনেতা নিজেই জোর করে ছেলের জন্য পাঞ্জাবি কিনে দেন। ছেলেকে বড় করার ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা থাকলেও বাবা-মা যে তাঁকে অনেক বেশি আগলে রেখেছেন, তা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি তিনি। জয়জিতের বক্তব্য, বিচ্ছেদের পর যশোজিৎ আরও পরিণত হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে গিয়ে ছেলের মনে যে দোলাচল তৈরি হতে পারে, সে বিষয়েও যথেষ্ট সচেতন অভিনেতা।

আরও পড়ুন: “বাম-তৃণমূল নেই, আছে কিছু শবদে*হ”, “অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস নেই কেন?” চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনায় রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা ঋদ্ধি সেন! “দলের রং দেখে অপরাধ বিচার হবে কেন?” অভিনেতার মন্তব্যে বিতর্ক, উঠল একাধিক প্রশ্ন!

বিবাহবিচ্ছেদ এবং সমাজের প্রতিক্রিয়া নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন জয়জিৎ। তাঁর মতে, কোনও সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সমাজ কী বলল, তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবতে চান না তিনি। অভিনেতার কথায়, “একটা কথা মহিলাদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেই বলতে চাই। সব বাবারাই, সে ডিভোর্সী হন বা বিবাহিত, সকলে সিঙ্গেল ফাদারই। সন্তানদের ভাল হলে মায়ের মতো আর খারাপ হলে বাবার মতো বলা হয়। আর আমার এত দিনের বিয়ে ভাঙা নিয়ে সমাজ কী বলল আমার যায় আসে না। সমাজ আমাকে খাওয়ায় না।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে সন্তানকে মানুষ করার ক্ষেত্রে বাবাদের দায়িত্ব এবং সমাজের প্রচলিত ধারণা নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, সন্তানের ভালো-মন্দের দায় শুধু একজন অভিভাবকের উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বাবা-মা দুজনেরই ভূমিকা থাকে, আর সেই দায়িত্বকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেতা।

ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পেশাগত ক্ষেত্রেও গত কয়েক বছরে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে জয়জিৎকে। সম্পর্কের টানাপড়েনের সঙ্গে কাজ কমে যাওয়ার সমস্যাও তাঁর জীবনে চাপ তৈরি করেছিল। অভিনেতা জানিয়েছেন, গত দু’বছরের পুজো তাঁর ভালো কাটেনি। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। তাঁর অভিনীত ধারাবাহিক ‘তিলোত্তমা’ সাফল্য পেয়েছে এবং সেখানে তাঁর অভিনীত ধূসর চরিত্রটিও দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এই সাফল্য তাঁকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। কঠিন সময় থেকে বেরিয়ে আসার পিছনে পরিচালক স্নেহাশিস চক্রবর্তীর অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন জয়জিৎ। তাঁর কথায়, স্নেহাশিসদা তাঁকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছেন এবং কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার সাহস দিয়েছেন। কাজের মধ্য দিয়েই তিনি অবসাদ কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন অভিনেতা।

একাকিত্ব এবং একা সন্তানকে বড় করে তোলার প্রসঙ্গে জয়জিতের বক্তব্য, আলাদা থাকা মানেই যে একজন মানুষ একা হয়ে যাবেন, এমনটা নয়। জীবনের পরিস্থিতি বদলালেও নিজের মতো করে ভালো থাকার পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তার নিজের সিদ্ধান্তকে সম্মান করাই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে যশোজিতের জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বুঝে তাকে মানসিকভাবে পাশে রাখার চেষ্টাও করছেন অভিনেতা। ব্যক্তিগত জীবনের নানা আলোচনা বা সমাজের বিচারকে নিজের জীবনের একমাত্র পরিচয় হতে দিতে চান না তিনি। বরং কাজ, পরিবার এবং কাছের মানুষদের সহযোগিতায় নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর দিকেই মন দিতে চান। এবারের পুজো জয়জিতের কাছে তাই শুধু উৎসব নয়, বরং কঠিন সময় পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসারও একটি উপলক্ষ।

You cannot copy content of this page