“বাম-তৃণমূল নেই, আছে কিছু শবদে*হ”, “অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস নেই কেন?” চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনায় রাজনৈতিক বিভাজনের বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা ঋদ্ধি সেন! “দলের রং দেখে অপরাধ বিচার হবে কেন?” অভিনেতার মন্তব্যে বিতর্ক, উঠল একাধিক প্রশ্ন!

দুর্গাপুজোর আনন্দের মধ্যেই চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনা শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে কলকাতায়। সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মৃতদের পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে, কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল এবং ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বাংলা বিনোদন জগতের একাধিক পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেতা ঋদ্ধি সেনও। সমাজমাধ্যমে নিজের মতামত জানিয়ে তিনি সরাসরি সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে আলোচনা।

চোরবাগানের ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছেন ঋদ্ধি। সেখানে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁর পোস্টের শুরুতেই একটি উদাহরণের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক স্বার্থের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। অভিনেতার বক্তব্য, পরিচিত কোনও দল নিজেদের নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে তুলে ধরলেও তাদের আসল পরিচয় জেনেও যদি মানুষ তাদের বিশ্বাস করেন, তা হলে পরবর্তীতে বিপদ তৈরি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাঁর মতে, জেনেশুনে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার ফলের জন্য অন্যকে দায়ী করা যায় না। এই প্রসঙ্গে তিনি মানুষের স্বার্থপরতা এবং সাময়িক উত্তেজনার প্রতি আকর্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ঋদ্ধির কথায়, ভয় এবং উত্তেজনা তৈরি করে মানুষকে প্রভাবিত করার প্রবণতাই যেন বর্তমান সময়ের অন্যতম সমস্যা হয়ে উঠেছে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিণতি নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন: “কুকুরের লেজ তো সোজা হবে না, তাই…” নিজের দরকারি জিনিস না পেয়ে খাবার ন’ষ্ট রাজবীরের, হঠাৎ কেন বিপাকে নন্দিনী? পাল্টা ‘দোগলা’ কটা’ক্ষে ফের প্রকাশ্যে রাজনন্দিনীর তিক্ততা? এবার কী সত্যিই ভাঙনের মুখে বিগ বসের টক-মিষ্টি জুটি?

এরপর চোরবাগানের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে আরও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা এখনও বিজেপির পক্ষ নিয়ে দলটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে তাঁদের অবস্থানও বদলে যেতে পারে। অন্যদিকে, যাঁরা বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে বাইরে বেরিয়েছিলেন অথচ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন, তাঁদের কথা ভেবেই শহরের মানুষকে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ঋদ্ধির মতে, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক মতভেদ সরিয়ে রেখে মানুষের নিরাপত্তা এবং মৃতদের প্রতি দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর পোস্টে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন এবং যাঁরা নিজের চোখে সেই ঘটনা দেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রণা কোনও রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে চলে যাওয়া উচিত নয়। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেছেন।

চোরবাগানের ঘটনার পাশাপাশি যাদবপুরে বামেদের বুকস্টল ভাঙার ঘটনাতেও সরব হয়েছেন ঋদ্ধি সেন। সপ্তমীর সময়েই ওই এলাকায় বুকস্টল ভাঙতে বুলডোজার নিয়ে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বিজেপির রাজনীতি, শিক্ষা, মুক্ত চিন্তা এবং নাগরিক অধিকারের বিষয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ঘৃণার রাজনীতি করে এবং শিক্ষা ও মুক্ত চিন্তার পরিসরকে আঘাত করে। পাশাপাশি ধর্ষণের অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়া, মিথ্যা ইতিহাস প্রচার এবং নাগরিকদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করার মতো বিষয় নিয়েও তিনি দলটির সমালোচনা করেছেন। তবে নিজের পোস্টে তিনি এটাও বলেছেন যে, পৃথিবীর বহু রাজনৈতিক দলের মধ্যেই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের অপরাধকে শুধু অন্য দলের সঙ্গে তুলনা করে ছোট করে দেখা উচিত নয়। যে দলের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠুক, সেই অভিযোগকে অপরাধ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিনেতা।

আরও পড়ুন: “প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গিয়েছে, ভিড় ঠেলে ফিরে এসে দেখি আমার স্ত্রী ও বৌদির…” “একজন যুবক দাঁড়িয়ে কাঁদছে…বাড়ি ফিরে দাদাকে কী কৈফিয়ত দেব?” “সেই নিষ্ঠুর অধ্যায় আজও ভাবলে ভয় করে, সেইদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর জীবনে ঠাকুর দেখা নয়!” কী এমন ঘটেছিল পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে, যে আজও কলকাতার দুর্গাপুজো মণ্ডপ এড়িয়ে চলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা?

ঋদ্ধির পোস্টের সবচেয়ে আলোচিত অংশে উঠে এসেছে চোরবাগানের দুর্ঘটনায় মৃতদের প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক দলগুলির নামের পরিবর্তে বর্তমানে শহরের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, এই মুহূর্তে বাম বা তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে প্রাণ হারানো মানুষগুলির কথা। যাঁরা জীবিত অবস্থায় শুধু বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছিলেন, তাঁদের মৃত্যু কোনও রাজনৈতিক তর্কের বিষয় হতে পারে না। পোস্টে তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনও অপরাধকে ছোট বা বড় করে দেখার প্রবণতা কতটা যুক্তিযুক্ত। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পক্ষপাত সরিয়ে রেখে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একইভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। চোরবাগানের ঘটনায় শোক প্রকাশের পাশাপাশি যাদবপুরের ঘটনাকে একই পোস্টে তুলে এনে ঋদ্ধি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীন চিন্তা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধা বিচার করা উচিত নয়।

সব মিলিয়ে চোরবাগান-কাণ্ড নিয়ে ঋদ্ধি সেনের পোস্টে শোক, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সমালোচনা একসঙ্গে উঠে এসেছে। দুর্গাপুজোর মতো আনন্দের উৎসবে এমন প্রাণহানির ঘটনা কেন ঘটল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিনোদন জগতের সদস্যরাও প্রশ্ন তুলছেন। ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ঋদ্ধির পোস্টে বিজেপির সমালোচনা এবং যাদবপুরের ঘটনার উল্লেখ নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিনেতা তাঁর বক্তব্যে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কথা বলেছেন। চোরবাগানের ঘটনায় ঠিক কী কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকেও নজর রয়েছে। তবে ঋদ্ধির স্পষ্ট বক্তব্য, রাজনৈতিক তর্কে ব্যস্ত না থেকে এই মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের কথা মনে রাখাই সবচেয়ে জরুরি।

You cannot copy content of this page