“প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গিয়েছে, ভিড় ঠেলে ফিরে এসে দেখি আমার স্ত্রী ও বৌদির…” “একজন যুবক দাঁড়িয়ে কাঁদছে…বাড়ি ফিরে দাদাকে কী কৈফিয়ত দেব?” “সেই নিষ্ঠুর অধ্যায় আজও ভাবলে ভয় করে, সেইদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর জীবনে ঠাকুর দেখা নয়!” কী এমন ঘটেছিল পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে, যে আজও কলকাতার দুর্গাপুজো মণ্ডপ এড়িয়ে চলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা?

বাংলা অভিনয় জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই হাসি, মজা আর অভিনয়ের অসাধারণ দক্ষতা। তবে ব্যক্তিগত জীবনে দুর্গাপুজো নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্যরকম। কলকাতার পুজো মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার আনন্দ বহু বছর আগেই তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে। এর পিছনে রয়েছে এমন একটি ঘটনা, যা আজও মনে পড়লে ভয় পেয়ে যান অভিনেতা। ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি থেকে শুরু করে যৌবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো নিয়ে তাঁর ভাবনা অন্যদের থেকে আলাদা। ১৮ অক্টোবর ছিল পরাণের জন্মদিন। ছিয়াশি বছরে পা দিয়ে নিজের জীবনের নানা স্মৃতির কথা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। সেই আলোচনাতেই উঠে এসেছে কেন বহু বছর ধরে কলকাতার পুজো মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।

ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পরাণ জানিয়েছেন, তাঁর কাছে দুর্গাপুজো মানেই আনন্দে মেতে ওঠার সময় নয়। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ার কারণে ছোটবেলায় অভাবের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূজার সাজ’ কবিতাটি পড়েছিলেন তিনি। কবিতার লাইনগুলিতে পুজোর আনন্দের ছবি ফুটে উঠলেও নিজের জীবনের সঙ্গে সেই আনন্দের মিল খুঁজে পেতেন না। কারণ, সংসারে তখন অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই কৈশোরেই বাড়ির সামনের পুজো মণ্ডপে এক দরিদ্র বালিকাকে দেখেছিলেন তিনি। মেয়েটির পরনে ছিল ছেঁড়া পোশাক, আর সে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল দেবী দুর্গার দিকে। সেই দৃশ্য তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মেয়েটির কথা আজও ভুলতে পারেননি অভিনেতা।

পরাণের কথায়, সেই মেয়েটির মুখ আর রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। একদিকে কবিতায় পুজোর সাজ, আনন্দ আর উৎসবের কথা, অন্যদিকে বাস্তবে অভাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শিশুর অসহায় ছবি। এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁকে ছোটবেলাতেই ভাবিয়ে তুলেছিল। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, যদি পুজো সবার আনন্দের উৎসব হয়, তা হলে সেই দরিদ্র মেয়েটির জীবনে আনন্দ কোথায়? অভিনেতার ধারণা, সেই বালিকা হয়তো এখন বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সেই ছোট্ট মুহূর্তটি আজও মনের মধ্যে রয়ে গিয়েছে। পরাণ জানিয়েছেন, সেই সময় থেকেই পুজোর আনন্দ নিয়ে তাঁর ভাবনা বদলে যায়। এমনকি সেই কৈশোরের অভিজ্ঞতার পর থেকে দুর্গাপুজোয় নতুন জামা বা প্যান্ট পরার অভ্যাসও আর রাখেননি তিনি। তাঁর কাছে সেই স্মৃতি আজও কষ্টের।

আরও পড়ুন: “কুকুরের লেজ তো সোজা হবে না, তাই…” নিজের দরকারি জিনিস না পেয়ে খাবার ন’ষ্ট রাজবীরের, হঠাৎ কেন বিপাকে নন্দিনী? পাল্টা ‘দোগলা’ কটা’ক্ষে ফের প্রকাশ্যে রাজনন্দিনীর তিক্ততা? এবার কী সত্যিই ভাঙনের মুখে বিগ বসের টক-মিষ্টি জুটি?

তবে কলকাতার পুজো মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে না যাওয়ার পিছনে আরও একটি বড় কারণ রয়েছে। যৌবনে স্ত্রী এবং বৌদিকে নিয়ে কালীঘাটের সংঘশ্রীর দুর্গাপুজো দেখতে গিয়েছিলেন পরাণ। সেই সময় ওই মণ্ডপটি কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় পুজো হিসেবে পরিচিত ছিল। ঠাকুর দেখার জন্য সেখানে মহিলা ও পুরুষদের আলাদা লাইনের ব্যবস্থা ছিল। ফলে সঙ্গে থাকা মহিলারা কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ত। পরাণ স্ত্রী ও বৌদিকে বলে গিয়েছিলেন, তিনি ঠাকুর দেখে ফিরে এসে নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়াবেন। কিন্তু ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখে ফিরে এসে দেখেন, তাঁরা সেখানে নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তাঁদের কোনও খোঁজ পাননি তিনি। দেখতে দেখতে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে যায়। সেই সময় তাঁর কাছে মোবাইল ফোনও ছিল না, ফলে যোগাযোগ করার কোনও সহজ উপায়ও ছিল না।

সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে পরাণ জানিয়েছেন, স্ত্রী ও বৌদিকে খুঁজে না পেয়ে তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর তাঁর কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একজন যুবক প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন, তা দেখতে খারাপ লাগবে ভেবেও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন। বাড়ি ফিরে দাদাকে কী বলবেন, সেই চিন্তাও তাঁকে তাড়া করছিল। তাঁর স্ত্রী ও বৌদি দুজনেই ছিলেন সুন্দরী যুবতী। তাঁরা দক্ষিণ কলকাতার রাস্তাঘাটও ভালো চিনতেন না। ফলে কোনও বিপদে পড়লেন কি না, সেই আশঙ্কা আরও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে গিয়ে মাইকে ঘোষণা করার অনুরোধ করেন পরাণ। সংঘশ্রী ক্লাবের তরফে ঘোষণা করা হয়, তিনি তাঁর স্ত্রী ও বৌদিকে খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু ঘোষণা হওয়ার পরেও তাঁদের দেখা মিলছিল না। এই অপেক্ষা ও দুশ্চিন্তার সময়টুকু তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টের হয়ে উঠেছিল।

অবশেষে স্ত্রী ও বৌদি ফিরে এলে স্বস্তি পান পরাণ। কিন্তু সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জীবনে আর কখনও কলকাতার পুজো মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে যাবেন না। পরবর্তীকালে সেই সিদ্ধান্ত আর বদলাননি তিনি। এখন দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে বাড়ির বারান্দায় বসে সময় কাটাতেই বেশি ভালো লাগে তাঁর। দূর থেকে ছোট ছোট শিশুদের বাবা-মায়ের হাত ধরে নতুন পোশাক পরে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন অভিনেতা। তাঁর কথায়, সাজগোজ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে বেরোয়, সেই দৃশ্য দেখেই তাঁর আনন্দ হয়। তাই অন্যদের মতো ভিড় ঠেলে মণ্ডপে গিয়ে ঠাকুর দেখার বদলে নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে পুজোর পরিবেশ উপভোগ করেন তিনি। ছোটবেলার অভাবের স্মৃতি এবং যৌবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, দুই ঘটনাই যেন বদলে দিয়েছে দুর্গাপুজো নিয়ে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত অনুভূতি।

You cannot copy content of this page