লক্ষ্মীপুজো মানেই ঘরে ঘরে দেবী আরাধনা, পাঁচালি পাঠ এবং সংসারের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা। তবে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের কাছে পুজোর অর্থ কিছুটা আলাদা। আড়ম্বরের চেয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে মনের যোগকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। নিজের বাড়িতে ছোট করে লক্ষ্মীপুজো করেন অভিনেত্রী। সেই পুজো ঘিরেই এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, ছোটবেলার ভাবনা এবং সমাজের প্রচলিত ধারণা নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন শ্রীলেখা। লক্ষ্মীর পাঁচালিতে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম নিয়ে তাঁর আপত্তি থেকে শুরু করে চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া, অভিনেত্রীর কথায় উঠে এল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। পাশাপাশি নিজের পোষ্যদের প্রতি ভালোবাসা এবং শব্দবাজি ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন তিনি।
শ্রীলেখার কথায়, ছোটবেলায় যখন তাঁর মা তাঁকে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে দিতেন, তখনই পাঁচালির কয়েকটি নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠত তাঁর মনে। বিশেষ করে, ‘পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না’, ‘স্বামীর আগে খাবে না’ এই ধরনের নির্দেশ মেনে নিতে পারতেন না তিনি। অভিনেত্রী জানান, মাত্র ১১-১২ বছর বয়সেই পাঁচালির এই অংশগুলি তিনি এড়িয়ে যেতেন। তখন হয়তো নারীবাদ সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি, কিন্তু তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত, একজন মেয়ে কেন নিজের ইচ্ছেমতো খেতে পারবে না? কেন স্বামী ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে জোরে কথা বলা বা হাসাহাসি করতে পারবে না? শ্রীলেখার মতে, এই বিধিনিষেধগুলি দেবী লক্ষ্মীর নিজস্ব বক্তব্য নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি ব্যাখ্যা।
তাঁর বিশ্বাস, যুগের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলানো প্রয়োজন। ধর্মীয় আচার পালন করতে গিয়ে নারীদের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। একই সঙ্গে নিজের পুজোর ধরন নিয়েও স্পষ্ট অভিনেত্রী। তাঁর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হয় খুব সাধারণভাবে। লোক দেখানো আড়ম্বর নয়, বরং নিজের আরাধ্য দেবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুই দেবীরই আশীর্বাদ চান তিনি। তবে অর্থ-সম্পদের পিছনে অন্ধভাবে ছোটা নয়, নিজের জীবনকে ভালোভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। নিজের জীবন ও বিশ্বাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রীলেখা জানান, তাঁর কাছে পুজোর অর্থ শুধু মন্দিরে যাওয়া বা নিয়ম মেনে আচার পালন করা নয়।
বাড়িতে থাকা পোষ্যদের যত্ন নেওয়াকেও তিনি ঈশ্বরের সেবা বলে মনে করেন। নিজের পোষ্যদের সন্তান হিসেবেই দেখেন অভিনেত্রী। লক্ষ্মীপুজোয় তাদের নামেই পুজো দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, পোষ্যরাই তাঁর পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেয়ে এবং বাড়িতে থাকা মাসিকে নিয়েই তাঁর ছোট্ট সংসার। সাক্ষাৎকারে নিজের মেয়ের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। মেয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা এবং তার স্বাধীন মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করেন অভিনেত্রী। নিজের মায়ের সঙ্গে দেবী দুর্গার মুখের মিল খোঁজার কথাও জানান তিনি। শ্রীলেখার মতে, মায়ের প্রতিমা দেখতে গিয়ে অনেক সময় নিজের মায়ের মুখ মনে পড়ে। তাই বিশাল আয়োজন বা দামি সাজসজ্জার চেয়ে সাধারণ প্রতিমার মধ্যেই তিনি বেশি আন্তরিকতা খুঁজে পান।
বড় বাজেটের পুজো বা সেরা মণ্ডপের প্রতিযোগিতা নিয়ে তাঁর আপত্তি না থাকলেও, সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে দেবীকে বিচার করার প্রবণতা তাঁর পছন্দ নয়। তাঁর মতে, পুজোর আসল বিষয়টি হল মনের সঙ্গে দেবীর যোগ তৈরি হওয়া। জীবনের কর্মফল এবং পরজন্ম নিয়েও নিজের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন অভিনেত্রী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে বলেও জানান তিনি। তবে কোনও নির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে নিজেকে বাঁধতে চান না শ্রীলেখা। সাক্ষাৎকারের অন্যতম আবেগঘন অংশে চোরবাগানের দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এবং শিশুদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তোলেন শ্রীলেখা। সেই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল বলে জানান অভিনেত্রী।
তাঁর কথায়, মাত্র সাত বছরের শিশুর মৃত্যুর খবর তাঁকে বারবার ভাবিয়েছে। তিনি কল্পনা করেছেন, দুর্ঘটনার আগের দিন যে শিশুরা নতুন জামাকাপড় পরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল, পরের দিন তারা আর নেই। অথচ তাঁদের মৃত্যুর পরেও উৎসব থেমে থাকেনি। অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমে যখন শুভেচ্ছাবার্তা ও উৎসবের ছবি দেখতে পান, তখন সেই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না বলে জানান তিনি। তবে যাঁরা স্বাভাবিকভাবে উৎসব পালন করেছেন, তাঁদের খারাপ বলছেন না অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যেক মানুষের আবেগ প্রকাশের ধরন আলাদা। কোনও ঘটনা কাউকে যতটা প্রভাবিত করে, অন্য কারও ক্ষেত্রে তার প্রভাব ততটা নাও হতে পারে। নিজেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে শ্রীলেখা বলেন, অন্যের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
বাবার মৃত্যুর পরেও দুর্গাপুজোর সঙ্গে তাঁর আবেগের সম্পর্ক বদলে গিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর একবার পুজোর সময় বাড়ি থেকে বেরোতে চাননি তিনি। এ বছরও দুর্ঘটনার খবর তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। একই সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান, তিনি সব সময় সরাসরি কথা বলেন। কূটনৈতিকভাবে কথা বলার অভ্যাস তাঁর নেই বলেই অনেক সময় মানুষ তাঁকে ভুল বোঝেন। তবে সকলের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার দায় তিনি অনুভব করেন না। তাঁর মতে, একজন প্রকৃত শিল্পীর সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। মানুষের আবেগ অনুভব করতে না পারলে শিল্পের প্রকৃত সৃজন সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকারের শেষে কালীপুজো ও দীপাবলি উপলক্ষে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ আবেদন জানান শ্রীলেখা। তাঁর মতে, উৎসবের আনন্দ যেন অন্য কোনও প্রাণীর কষ্টের কারণ না হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুনঃ “অন্যের ছবি খারাপ চললে যেন আরেকজন খুব আনন্দ পায়, এখন উন্মাদনার চেয়ে কাদা ছোড়াছুড়িই বেশি” “উত্তম কুমারকেও পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল” বর্তমানে টলিউডের পুজোর ছবি নিয়ে বি*স্ফোরক শুভাশিস মুখোপাধ্যায়! উত্তর কলকাতার পুজোর স্মৃতি থেকে মহানায়কের ব্যর্থতা, অভিনেতার কথায় উঠে এল কোন অজানা অধ্যায়?
বিশেষ করে পোষ্য, পথের কুকুর-বিড়াল, পাখি এবং বাড়িতে থাকা বয়স্ক মানুষদের কথা মাথায় রেখে শব্দবাজি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানান তিনি। শ্রীলেখার কথায়, অতিরিক্ত শব্দে পশুপাখিরা আতঙ্কিত হয়, এমনকী তাদের মৃত্যুও হতে পারে। বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রেও প্রবল শব্দ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই হাসপাতালের আশপাশে বাজি না ফাটানো এবং শব্দবাজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আবেদন জানিয়েছেন অভিনেত্রী। কোথাও পশুদের উপর নির্যাতন হতে দেখলে সংশ্লিষ্ট থানায় খবর দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, বাড়ি আলো দিয়ে সাজানো, প্রদীপ জ্বালানো এবং অন্যের কষ্টের কথা মাথায় রাখার মধ্য দিয়েও উৎসবের আনন্দ উদযাপন করা যায়। সব মিলিয়ে, শ্রীলেখা মিত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নারীস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, মানবিকতা এবং পশুপ্রেমের মতো একাধিক বিষয়। তাঁর কাছে পুজোর আসল অর্থ শুধু দেবীর আরাধনা নয়, বরং অসহায় প্রাণীদের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যের যন্ত্রণাকে অনুভব করতে পারাও।






