টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সাগ্নিক চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে অভিনয়ের পাশাপাশি রয়েছে এক দীর্ঘ ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্প। ছোটবেলা থেকেই বড় পর্দায় নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর আদর্শ। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে ব্যবসার জগতে নিজের জায়গা তৈরি করুক, কিন্তু সাগ্নিকের মন পড়ে থাকত অভিনয়ের দুনিয়ায়। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যদিও ইন্ডাস্ট্রিতে এসে প্রথম থেকেই নায়ক হওয়ার সুযোগ পাননি। বরং নানা প্রতিকূলতার কারণে শেষ পর্যন্ত খলনায়কের চরিত্রেই নিজের অভিনয়ের জায়গা তৈরি করতে হয় তাঁকে। পরবর্তীকালে সেই নেতিবাচক চরিত্রগুলিই দর্শকের কাছে তাঁর পরিচিতি হয়ে ওঠে। বর্তমানে সিনেমা থেকে ধারাবাহিক, দুই মাধ্যমেই সমানভাবে কাজ করছেন অভিনেতা। তবে পর্দার বাইরেও এমন একটি লড়াই রয়েছে, যা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় পরিচয়।
২০০৪ সালে ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধাক্কা আসে সাগ্নিকের। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দুই সন্তানকে নিজের দায়িত্বে বড় করে তোলার সিদ্ধান্ত নেন অভিনেতা। সেই সময় আদালতে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন স্ত্রী তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তিনি নাকি সন্তানদের ঠিকমতো মানুষ করে তুলতে পারবেন না। এমনকী সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি আগ্রহ দেখাননি বলে আগে জানিয়েছিলেন সাগ্নিক। সেই কথাগুলি অভিনেতার মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে হার না মেনে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য করে নেন তিনি। একদিকে অভিনয়ের কাজ, অন্যদিকে সংসার এবং সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব, সবকিছুই সামলাতে হয়েছে তাঁকে। সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে তাঁর দুই সন্তান। বিশেষ করে মেয়ের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকার মানসিকতা বরাবরই গর্বিত করেছে অভিনেতাকে। এবার সেই মেয়েই জীবনের এক বিরাট সাফল্য অর্জন করায় আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না সাগ্নিক।
সামাজিক মাধ্যমে মেয়ের একাধিক ছবি ভাগ করে নিয়ে জানালেন, কীভাবে ছোটবেলা থেকে আজকের এই জায়গায় পৌঁছেছে সে। মেয়ের এই সাফল্য উদযাপন করতে গিয়ে তার ছোটবেলার নানা মজার স্মৃতিও তুলে ধরেছেন অভিনেতা। জানিয়েছেন, ছোটবেলায় মেয়ে ‘পাউরুটি’কে ‘পাউটুনি’ বলত। এমনকী কোনও দোকানে কিছু কিনতে পাঠালেও কী বলতে হবে, সেই ভয় পেত সে। বাবার কথায়, বাড়ির পাশাপাশি জীবনের নানা পরিস্থিতিতেও তাঁর পাশে থেকে মেয়েকেও অনেক লড়াই করতে হয়েছে। পড়াশোনার জন্য একসময় সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও ৯২ শতাংশ নম্বর থাকা সত্ত্বেও সেখানে ভর্তি হতে পারেনি। কেন সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল, তা অবশ্য প্রকাশ্যে আনেননি সাগ্নিক। তবে সেই ব্যর্থতায় থেমে থাকেনি মেয়ে।
বরং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সোশিওলজি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত নাচও চালিয়ে গিয়েছে সে। বাবার কথায়, মেয়ের নিজের পছন্দের কাজে তিনি কখনও বাধা দেননি। বরং প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগী থেকেছে সে। এরপর নানা ওঠাপড়ার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সায়নী। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে জার্মানির বামবার্গ ইউনিভার্সিটিতে সোশিওলজি নিয়ে মাস্টার্স করতে যায় সে। সেখান থেকে নেদারল্যান্ডসের টিলবার্গ ইউনিভার্সিটিতে ডাবল এমএ সম্পূর্ণ করে। এরপর মেয়ের শিক্ষাজীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিঙ্গেন ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে সোশিওলজি নিয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পায় সায়নী।
এই গোটা যাত্রাপথ সম্পূর্ণ করতে তার সময় লেগেছে টানা সাত বছর। আর সেই দীর্ঘ সময়ের অধিকাংশটাই বিদেশে একা থেকে নিজের পড়াশোনা এবং গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। গত ২ নভেম্বর, ২০২৬ ছিল সায়নীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন নিজের গবেষণাপত্র নিয়ে জুরিদের সামনে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হয় তাকে। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘আ ফ্র্যাজাইল অ্যাচিভমেন্ট’। একের পর এক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে সায়নীকে। তবে মেয়ের সেই বিশেষ দিনে বাবা সাগ্নিক শারীরিকভাবে পাশে থাকতে পারেননি। মেয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিত থাকার জন্য ভিসার আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাননি তিনি। ফলে বাড়িতে বসেই সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে মেয়ের ডিসার্টেশন দেখছিলেন। এতজন জুরির সামনে মেয়েকে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিতে দেখে কিছুটা ভয়ও পেয়েছিলেন অভিনেতা।
কিন্তু সায়নীর আত্মবিশ্বাস তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল। পর্দার ওপারে বসে মেয়ের প্রতিটি উত্তর মন দিয়ে শুনেছেন তিনি। অপেক্ষা করছিলেন সেই একটি ঘোষণার জন্য, যার পিছনে লুকিয়ে ছিল সাত বছরের পরিশ্রম। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়। সায়নী সফলভাবে নিজের ডিফেন্স সম্পূর্ণ করে এবং পিএইচডি অর্জন করে। মেয়ের এই সাফল্যের পরেই সাগ্নিকের আবেগঘন বার্তা, এবার থেকে তাঁর মেয়ে পরিচিত হবে ডক্টর সায়নী সাঁতরা নামে। সামাজিক মাধ্যমে অভিনেতা লেখেন, “ডিফেন্স ক্লিয়ার করলি অ্যান্ড নাউ ইউ আর ডক্টর সায়নী সাঁতরা। বাবা হয়ে তোকে কুর্নিশ জানাই নেহা।” মেয়ের এই সাফল্যকে নিজের জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “এবার নন্দনে অভিনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ছবি থাকবে না!” “আপনারা এখনও ওঁর নাম দেখতে চান? আমি তাহলে থাকছি না!” নন্দন থেকে মমতার নাম সরতেই একপক্ষের বিরোধিতা নিয়ে হুঁশিয়ারি মিঠুন চক্রবর্তীর! ‘ছেলে মিমোহর কেসটা মিটেছে?’ ‘সবার প্রিয় নায়ক থেকে কোথায় নেমে যাচ্ছেন ভেবে দেখবেন!’ ‘ছন্দে ছন্দে রং বদলায়’, মহাগুরুর তীব্র সমালোচনা নেটপাড়ায়!
একসময় আদালতে দাঁড়িয়ে যে প্রাক্তন স্ত্রী প্রশ্ন তুলেছিলেন, সাগ্নিক সন্তানদের মানুষ করতে পারবেন কি না, আজ মেয়ের এই অর্জন যেন তারই উত্তর দিয়ে দিল। এর আগে ২০১৮ সালে মেয়ের জার্মানিতে পিএইচডির সুযোগ পাওয়ার খবরেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন অভিনেতা। এবার সাত বছরের উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মেয়ের নামের আগে ডক্টর উপাধি যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনন্দ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। কোনও প্রতিশোধের কথা না বলে মেয়ের সাফল্যকেই নিজের সবচেয়ে বড় জবাব হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। যে সন্তানকে একা হাতে বড় করে তোলার সামর্থ্য নিয়ে একদিন প্রশ্ন উঠেছিল, আজ সেই সন্তানের কৃতিত্বেই গর্বিত বাবা সাগ্নিক।






