একসময় বাংলা সিনেমার পর্দায় ছোট্ট একটি মুখ দর্শকদের বেশ নজর কেড়েছিল। বয়সে ছোট হলেও অভিনয়ের সহজাত দক্ষতায় অনেকের মন জয় করেছিলেন তিনি। সেই সময় টলিউডে তাঁর পরিচয় ছিল ‘মাস্টার স্বর্ণেন্দু’ নামে। পরপর কয়েকটি বাংলা ছবিতে অভিনয় করে শিশুশিল্পী হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন স্বর্ণেন্দু রায়। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর জীবনের লক্ষ্য বদলে যায়। যে অভিনয় একসময় তাঁকে দর্শকদের কাছে পরিচিত করেছিল, সেই জগৎ থেকেই একদিন সরে দাঁড়ান তিনি। এরপর আর কোনও ছবিতে তাঁকে দেখা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই পুরনো দিনের বাংলা সিনেমার দর্শকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কোথায় গেলেন সেই ছোট্ট অভিনেতা? অভিনয় ছেড়ে বর্তমানে কোন পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি? তাঁর বর্তমান জীবন সম্পর্কে অনেকেরই হয়তো কোনও ধারণা নেই।
স্বর্ণেন্দুর অভিনয়জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ১৯৮৮ সালের বাংলা ছবি ‘আগমন’। এই ছবিতে তাপস পালের শৈশবের চরিত্রটি পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। চরিত্রটির সঙ্গে মানানসই অভিনয় এবং স্বাভাবিক অভিব্যক্তির জন্য দর্শকদের নজরে পড়েন স্বর্ণেন্দু। ‘আগমন’-এর পর বাংলা ছবিতে তাঁর কাজের সুযোগও বাড়তে থাকে। ‘আক্রোশ’, ‘মঙ্গলদ্বীপ’ এবং ‘বিদ্রোহী’র মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় বাংলা সিনেমার একাধিক পরিচিত অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। প্রসেনজিৎ, রঞ্জিত মল্লিক এবং তাপস পালের মতো তারকাদের সঙ্গে একই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন এই শিশুশিল্পী। ফলে অল্প বয়সেই বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাঁর একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পর্দায় এই সাফল্য সত্ত্বেও ভবিষ্যতে অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেননি তিনি।
স্বর্ণেন্দুর জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে পড়াশোনার ব্যস্ততা বাড়ার পর। ছোট থেকেই পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনাও ছিল অন্যরকম। একদিকে সিনেমার কাজ, অন্যদিকে পড়াশোনার দায়িত্ব, দুটো একসঙ্গে সামলানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত অভিনয়ের কাজ কমিয়ে পড়াশোনায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার পথ বেছে নেন তিনি। এরপর আর ক্যামেরার সামনে নিয়মিত দাঁড়ানো হয়নি তাঁর। ধীরে ধীরে শিশুশিল্পী হিসেবে পাওয়া পরিচিতিও যেন অতীতের স্মৃতি হয়ে যায়। তবে অভিনয় থেকে সরে গেলেও নিজের শিক্ষাজীবনে কোনও বিরতি দেননি স্বর্ণেন্দু। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে গবেষণার কাজেও এগিয়ে যান। ২০০৬ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। অর্থাৎ যে ছেলেটি একসময় বাংলা ছবিতে তাপস পালের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার জোরে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পেশায় প্রতিষ্ঠিত হন।
বর্তমানে স্বর্ণেন্দুর কর্মজীবনের ঠিকানা বেঙ্গালুরু। সেখানে পরিচিত সংস্থা ‘সেল ইন্ডিয়া’তে টেকনিক্যাল সেফটি কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন তিনি। সিনেমার শুটিং, পরিচালকদের সঙ্গে কাজ কিংবা ক্যামেরার সামনে অভিনয়, এসবের কোনওটিই এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ নয়। বরং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগিয়েই এগিয়ে চলেছেন তিনি। একসময় যে নামের সঙ্গে ‘মাস্টার’ শব্দটি জুড়ে ছিল, সেই পরিচয়ের বাইরে আজ তাঁর আলাদা কর্মজীবন রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনেও নিজের মতো করে সংসার সাজিয়েছেন স্বর্ণেন্দু। স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বেঙ্গালুরুতেই তাঁর পারিবারিক জীবন কাটছে। ছোটবেলায় বাংলা সিনেমার পরিচিত অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে যে জগতে তাঁর যাতায়াত ছিল, বর্তমানে সেই বিনোদন দুনিয়া থেকে তিনি অনেকটাই দূরে। অভিনয়ের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা না করে নিজের পছন্দের পেশাতেই মন দিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ “নিজেকে শিবের উপাসক বলে, তাঁর মুখে এমন নোংরা ভাষা ও মনে হিংসা? নারীদের অসম্মান করেন কী করে?” “ওদের সম্পর্কে এত আপত্তি কেন, সৃজলাকে নিয়ে ফুটেজ না পেয়েই গা জ্ব’লছে?” নন্দিনীকে বলেছিলেন ‘ছেলেধরা, ছেলে ছাড়া চলেই না’, এবার রাজবীরকে বললেন ‘নন্দিনীকে নষ্ট করেছিস তুই’! ন্যাশনাল টেলিভিশনে কদর্য ভাষা প্রয়োগ, ‘ভণ্ড সাধু’ জিতু কমলকে একহাত নিলেন দর্শকরা!
স্বর্ণেন্দুর জীবনযাত্রার এই পরিবর্তন বাংলা সিনেমার পুরনো দর্শকদের কাছে বেশ কৌতূহলের বিষয় হতে পারে। কারণ, শিশুশিল্পী হিসেবে যাঁকে একসময় নিয়মিত ছবিতে দেখা যেত, তাঁর বর্তমান পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা। অভিনয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া পরিচিতিকে পেশাগত জীবনের ভিত্তি না বানিয়ে তিনি নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন শিক্ষার পথ। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা, পিএইচডি এবং পরবর্তীকালে বেঙ্গালুরুতে কাজ, সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে গিয়েছে অনেকটাই। তবে ‘আগমন’, ‘আক্রোশ’, ‘মঙ্গলদ্বীপ’ কিংবা ‘বিদ্রোহী’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয়ের স্মৃতি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে তাপস পালের ছোটবেলার চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে যে পরিচিতি দিয়েছিল, সেটি এখনও তাঁর পুরনো দর্শকদের মনে থাকতে পারে। পর্দার আলো থেকে দূরে সরে গেলেও নিজের কর্মজীবন ও পরিবার নিয়ে বর্তমানে ব্যস্ত রয়েছেন একসময়ের সেই পরিচিত শিশুশিল্পী স্বর্ণেন্দু রায়।






