“একজন শিল্পীর সম্মান যদি না থাকে, তাহলে আর কী থাকে? টাকা-পয়সা একদিকে, সম্মানটাই আসল!” “ওনার ব্যক্তিগত ইচ্ছে বা জীবনকে যেভাবে পরিচালিত করেছেন…” ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারি নিয়ে মুখ খুললেন জয়তী চক্রবর্তী! হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া কঠিন, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে কি প্রশ্নের মুখে পড়েছে বাংলার শিল্পীদের সম্মান? কি জানালেন গায়িকা?

গত ১৫ বছরে বাংলার বিনোদন জগতে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে। শুধু অভিনয় জগৎ নয়, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির জগতেও রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার সমীকরণ এবং নানা বিতর্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। শিল্পীদের কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়েও চর্চা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁর গ্রেফতারি সেই বিতর্ককে আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। এবার এই ঘটনায় মুখ খুলে শিল্পীর সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন তুললেন গায়িকা জয়তী চক্রবর্তী।

দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রিকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গত ২৮ অক্টোবর কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। অভিযোগ, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাস আর্ট নামে একটি সংস্থা ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশপত্র বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করেছিল। ওই সংস্থার সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনের যোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর দাবি, এই ঘটনায় প্রায় ৩৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। যদিও তদন্তকারীরা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ এবং লেনদেনের গতিপ্রকৃতি খতিয়ে দেখছেন। ইডিও পৃথকভাবে অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্ত করছে।

২৯ অক্টোবর আদালতে পেশ করা হলে ইন্দ্রনীলকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, এই সংস্থার সঙ্গে নিজের কোনও যোগ নেই এবং টিকিট বিক্রির বিষয়টি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না বলে দাবি করেছেন ইন্দ্রনীল। এই পরিস্থিতিতেই ইন্দ্রনীল সেন প্রসঙ্গে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন জয়তী চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাগ কিংবা বিশেষ কোনও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ নেই। একজন সাধারণ শিল্পী হিসেবেই তিনি ইন্দ্রনীলকে দেখেছেন এবং দেখতে চান। জয়তী জানান, ইন্দ্রনীলের গান শুনেই তিনি বড় হয়েছেন। তাঁর গানের প্রতি নিজের ভালো লাগার কথা স্বীকার করে গায়িকা বলেন, গানবাজনার ক্ষেত্রে তিনি কখনও অতিরিক্ত সাহায্য বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি। ঈশ্বরের কৃপায় তার প্রয়োজনও পড়েনি।

তাই ইন্দ্রনীলকে নিয়ে তাঁর এই খারাপ লাগার পিছনে কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। বরং একজন শিল্পী হিসেবে আরেকজন শিল্পীর বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে ব্যথিত করেছে। জয়তীর মতে, একজন শিল্পীর কাছে অর্থ, প্রতিপত্তি কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর সম্মান। তিনি বলেন, “একজন শিল্পীর সম্মান এটুকুই। টাকা-পয়সা সবকিছু একদিকে, সম্মান আরেকদিকে। সেই সম্মানটুকু যদি না থাকে, একজন শিল্পীর আর কিছু থাকে না আমার কাছে।” ইন্দ্রনীলের ব্যক্তিগত জীবন কিংবা নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন নিয়ে তাঁর কোনও বক্তব্য নেই বলেও স্পষ্ট করেছেন গায়িকা। একজন মানুষ কীভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করবেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একজন শিল্পীর দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান ও গৌরব হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টের। তাঁর কথায়, হারানো সম্মান ও গৌরব ফিরে পাওয়া খুব কঠিন। তাই দ্রুত এই পরিস্থিতির মীমাংসা হওয়া উচিত বলেই মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ কৃষ্ণের শরীরে তিনটি জায়গা বাঁকা, রামের বরং সবটা সোজা! “পুজোর আগে বাতেলা দিয়ে টিআরপি বেড়েছিল, বিরল গিনেস বুক অফ রেকর্ডসে নাম লেখানোর দৌড়ে নেমেছেন…রান বাবা রান” ক্ষমা চেয়েও রেহাই নেই! দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়া হিন্দু বাঙালিদের বলেছিলেন ‘পাখণ্ডী’, রাম-কৃষ্ণের তুলনা ফের টেনে বিতর্কে বাগেশ্বর বাবা! এবার ‘ঢপেশ্বর’কে একহাত কীভাবে নিলেন ঋত্বিক চক্রবর্তী?

ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কতটা, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে। তবে এই ঘটনা যে শিল্পীমহলে যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করেছে, তা জয়তী চক্রবর্তীর বক্তব্যেই স্পষ্ট। কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ বা আক্রোশ থেকে নয়, বরং একজন শিল্পী হিসেবে ইন্দ্রনীল সেনের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁর বর্তমান পরিস্থিতিতে খারাপ লাগার জায়গা থেকেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গায়িকা। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, একজন শিল্পীর জীবনে অর্জিত সম্মান ও গৌরবের গুরুত্ব। আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কী উঠে আসে, সেটাই এখন দেখার। তবে জয়তীর আক্ষেপ, কোনও শিল্পীর দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।

You cannot copy content of this page