বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে রত্না ঘোষাল মানেই ‘ছোট বউ’ ছবির সেই কুখ্যাত ননদ লতু। অঞ্জন চৌধুরীর পরিচালনায় এই চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে রয়েছে। পুঁটিমাছ নিয়ে লতুর সেই বিখ্যাত সংলাপ এখনও অনেকের মুখে মুখে ফেরে। পর্দায় কখনও বড় বউয়ের নামে মায়ের কাছে নালিশ করা, কখনও ছোট বউয়ের শাড়ি নিয়ে নেওয়া, আবার কখনও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সব মিলিয়ে সংসারে অশান্তি তৈরি করাই ছিল লতুর কাজ। তবে আশ্চর্যের বিষয়, যে অভিনেত্রীকে দর্শক এমন নেতিবাচক চরিত্রে দেখে অভ্যস্ত, তিনিই একসময় পর্দায় মা লক্ষ্মী, মা কালী এবং মা তারার মতো দেবীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। একই অভিনেত্রীর মধ্যে এমন দুই বিপরীত রূপ কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? আনন্দবাজার অনলাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়জীবনের নানা অজানা অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী।
‘ছোট বউ’ ছবিতে লতুর চরিত্রে অভিনয় করার আগে পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী তাঁকে এই চরিত্রের কথা জানিয়েছিলেন। রত্নার কথায়, অঞ্জনদা তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘তোকে একটা রোল দিচ্ছি, যে চরিত্র করে তুই লোকের কাছে গালাগালি খাবি। কিন্তু অভিনয়ের জন্য তোর সুনাম হবে।’’ এমন চরিত্র কেন তাঁকে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে পরিচালকের কাছে প্রশ্নও করেছিলেন অভিনেত্রী। উত্তরে অঞ্জন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘‘করে দেখ না, এই পার্টগুলো করতে খুব মজা লাগে।’’ তবে শুটিংয়ের সময় নিজের চরিত্রের কাজকর্ম দেখে মাঝেমধ্যেই খারাপ লাগত রত্নার। একটি ছোট ছেলের মুখ থেকে হরলিক্স কেড়ে নেওয়া, বাড়ির বউদের নামে মায়ের কাছে নালিশ করা কিংবা বাবাকে অপমান করার মতো দৃশ্য করতে গিয়ে অস্বস্তি হত তাঁর। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘আমি কি খারাপ ডায়লগ বলছি?’’ এমন প্রশ্নও মনে জাগত। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। দর্শক লতুর খারাপ দিকগুলিই বেশ পছন্দ করেছিলেন। আজও রাস্তাঘাটে তাঁকে দেখলে অনেকে লতু বলে ডাকেন এবং পুঁটিমাছের সেই সংলাপ শোনানোর আবদার করেন। এমনকি বর্তমান প্রজন্মের কাছেও তিনি লতু নামেই পরিচিত।
তবে রত্না ঘোষালের অভিনয়জীবন শুধু নেতিবাচক চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির নানা ধরনের মেয়ের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। কলকাতা দূরদর্শনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘নাচনি’-তে তিনি ছিলেন নায়িকা। অন্য দিকে, দেবীর চরিত্রেও একসময় যথেষ্ট পরিচিতি তৈরি হয়েছিল তাঁর। ১৯৭৭ সালে ‘শ্রী শ্রী মা লক্ষ্মী’ ছবিতে দেবী লক্ষ্মীর ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন রত্না। সেই ছবিতে সন্ধ্যারাণী, কমল মিত্র, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দে এবং অসীম কুমারের মতো অভিনেতারাও ছিলেন। প্রতি বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময় টেলিভিশনে ছবিটি দেখানো হত। সেই সময় ‘নহবৎ’ নাটক নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে অভিনয় করতে যেতেন তিনি। একবার একটি গ্রামে নাটকের জন্য মেকআপ করার সময় আয়োজকদের কয়েকজন এসে তাঁকে বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁদের কথায়, ‘‘রত্নাদি আপনাকে এক বার বাইরে যেতে হবে। কারণ মা লক্ষ্মী আপনি গ্রামে এসেছেন।’’ বাইরে বেরিয়ে অভিনেত্রী দেখেন, তাঁকে দেখার জন্য আট থেকে আশি বয়সের অসংখ্য মানুষের বিশাল লাইন তৈরি হয়েছে। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছিলেন।
‘ছোট বউ’-এর লতু চরিত্র জনপ্রিয় হওয়ার পরেও রত্না চাননি দর্শক তাঁকে শুধু বাংলা ছবির ভ্যাম্প হিসেবেই চিনুন। তাঁর কথায়, সাতের দশকে তিনি প্রচুর দেবীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘দেবীতীর্থ কামরূপ কামাখ্যা’ ছবিতে কামাখ্যা মায়ের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। ‘নল দময়ন্তী’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মা লক্ষ্মী হিসেবে। সুজিত গুহর ‘ক্ষ্যাপা ঠাকুর’ ছবিতে হয়েছিলেন মা তারা এবং ‘মাতৃভক্ত রামপ্রসাদ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মা কালীর চরিত্রে। সেই ছবিতে রামপ্রসাদের ভূমিকায় ছিলেন অসীম কুমার। অভিনেত্রীর কথায়, সেই সময় প্রচুর পৌরাণিক ছবি তৈরি হত। অনেকেই তাঁর মুখের সঙ্গে দেবীর মুখের মিল খুঁজে পেতেন। তাই লক্ষ্মী এবং কালী হওয়ার প্রস্তাবও নিয়মিত আসত। পরে অঞ্জন চৌধুরীর ‘ছোট বউ’-এর লতু চরিত্রটি তাঁর পরিচিতির সঙ্গে জুড়ে যায়। তবে দেবীর চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা আজও তাঁর কাছে বিশেষ স্মরণীয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের স্বত্ব নিতে একবার ভাটপাড়ায় লেখকের ছেলের বাড়িতে গিয়েছিলেন রত্না। সেখানে বৃদ্ধ ভদ্রলোক তাঁকে দেখে বলেছিলেন, ‘‘সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী আমার বাড়িতে এসেছেন। যতই খলনায়িকা করুন, আমাদের কাছে আজও আপনি মা লক্ষ্মী।’’ বাড়ির ছোটদের ডেকে তাঁকে প্রণাম করতেও বলেছিলেন তিনি। এমনকি তারাশঙ্করের যেসব গল্পের স্বত্ব রত্না নিয়েছিলেন, তার জন্য তাঁর কাছ থেকে অর্ধেক টাকা নিয়েছিলেন লেখকের ছেলে।
আরও পড়ুনঃ “সবাই আমাকে স্যার বলবে, ‘আমি সবার বাবা’ এমন একটা ইমেজ নিয়ে ঘুরছে!” “একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হয়েও একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে অপমান করেছে!” জিতু কমলকে নিয়ে বি*স্ফোরক নন্দিনীর বাবা ও মা! “একমাত্র আমার মেয়েরই জিতুকে কাউন্টার করার ক্ষমতা আছে!” মেয়ের সাহসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, অভিনেতার বিরুদ্ধে আর কী কী অভিযোগ তুললেন তাঁরা?
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা এবং পরিচালনার কাজেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন রত্না ঘোষাল। তাঁর দাবি, বাংলা ভাষায় তিনিই প্রথম অভিনেত্রী, যিনি টেলিভিশন ধারাবাহিক তৈরির জন্য নিজের প্রযোজনা সংস্থা শুরু করেছিলেন। সংস্থাটির নাম ছিল ‘ইউনিফোকাস’। সেই সময় তিনি সিনেমায় অভিনয় করাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রযোজনা সংস্থার কাজের মাধ্যমেই পরবর্তীকালে একাধিক পরিচিত শিল্পী নিজেদের জায়গা তৈরি করেন। রত্নার কথায়, তাঁর ঘর থেকেই অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাঁর প্রযোজিত ‘রং-বেরং’ ধারাবাহিক দেখেই প্রভাত চক্রবর্তী ঋতুপর্ণাকে ‘শ্বেতপাথরের থালা’ ছবিতে সুযোগ দিয়েছিলেন। অভিনেতা রাজেশ শর্মা, কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায় এবং পরিচালক অরিন্দম শীলের কাজের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে তাঁর সংস্থার নাম। গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকেও প্রথম সুযোগ দিয়েছিলেন রত্না। তাঁর ‘গ্রহণ’ ধারাবাহিকের টাইটেল সং গেয়েই পরিচিতি পান ইন্দ্রনীল। কলকাতা দূরদর্শন থেকে ইটিভি বাংলা, বিভিন্ন চ্যানেলের একাধিক অনুষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিল তাঁর প্রযোজনা সংস্থা। সব মিলিয়ে অভিনেত্রী হিসেবে যেমন নানা ধরনের চরিত্রে দর্শকদের মন জয় করেছেন, তেমনই প্রযোজক হিসেবেও বাংলা বিনোদন জগতে নিজের অবদান রেখেছেন রত্না ঘোষাল।






