দিনে চাকরি, অবসরে অভিনয়! শিশিরকুমার ভাদুড়ির হাত ধরে অভিনয়ের জগতে পা, কাজ করেছেন সত্যজিৎ-মৃণাল-তরুণ মজুমদারের সঙ্গে! শেষ বয়সেও দাপিয়ে অভিনয়, জন্মশতবর্ষে ফিরে দেখা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণময় জীবন! নিউমোনিয়ায় আ’ক্রান্ত হয়ে মৃ’ত্যু, বাংলা চলচ্চিত্রের সেই পরিচিত মুখের জীবনের অজানা লড়াই জানেন?

আজ ৬ নভেম্বর। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত ও দক্ষ অভিনেতা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি প্রয়াত হন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। আজ তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হল। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে কখনও নায়ক, কখনও বাবা, কখনও বা পরিবারের অভিভাবকের চরিত্রে পর্দায় ধরা দিয়েছেন তিনি। সত্যজিৎ রায় থেকে মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার থেকে সন্দীপ রায়, বাংলা চলচ্চিত্রের একাধিক স্বনামধন্য পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন হারাধন। তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল চরিত্রের আকার বা সংলাপের পরিমাণ নয়, বরং অল্প সময়ের উপস্থিতিতেও দর্শকের মনে ছাপ ফেলে যাওয়ার ক্ষমতা। প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও নিজের অভিনয়ের পরিচয় তৈরি করেছিলেন এই শিল্পী।

কুষ্টিয়ার স্কুলে পড়াশোনা শুরু হারাধনের। ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। এরপর কলকাতার সিটি কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই নাটক ও অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি এবং সেই কারণে কারাবাসও করতে হয়েছিল তাঁকে বলে জানা যায়। অভিনয়ের জগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ির অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দক্ষ করে তোলে। তবে শুধু অভিনয়ের উপর নির্ভর করে সংসার চালানোর পথে হাঁটেননি হারাধন। কর্মজীবনের শুরুতে গান অ্যান্ড শেল কারখানায় কাজ করার পর একটি বিমা সংস্থায় যোগ দেন। সেখানেই অবসর নেওয়া পর্যন্ত কাজ করেছেন। অর্থাৎ দিনের চাকরি সামলে অভিনয় এবং নাটকের জগতেও সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন তিনি।

১৯৪৮ সালে অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘দেবদূত’ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় হারাধনের। এরপর ধীরে ধীরে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘মহানগর’, ‘কাপুরুষ’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘শাখা প্রশাখা’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে মুকুলের বাবা এবং ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর মতো ছবিতে তাঁর উপস্থিতি আজও বাংলা সিনেমার অনুরাগীদের কাছে স্মরণীয়। মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। অন্যদিকে তরুণ মজুমদারের ‘নিমন্ত্রণ’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘গণদেবতা’ এবং ‘ঠগিনী’র মতো ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। শুধু বড় পরিচালকদের ছবিই নয়, ‘কন্যা’ ছবিতে ভেলো চরিত্রেও বিশেষভাবে নজর কেড়েছিলেন হারাধন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অভিনয়ের রসায়নও দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চাভিনয়েও ছিল হারাধনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। প্রায় ১০০টি নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। মঞ্চের একাধিক পরিচিত শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি উৎপল দত্তের বিখ্যাত নাটক ‘ফেরারি ফৌজ’-এও অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ের প্রতি এই দীর্ঘ নিষ্ঠার স্বীকৃতিও পেয়েছেন জীবদ্দশায়। ২০০৪ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘ক্রান্তিকাল’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতার সম্মান পান তিনি। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। জীবনের শেষ দিকেও অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি হারাধন। অনুরাগ বসুর হিন্দি ছবি ‘বরফি!’তে দাজুর চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। বিদ্যা বালান অভিনীত হিন্দি ছবি ‘পরিণীতা’তেও কাজ করেছিলেন তিনি। জীবনের শেষ পর্যায়েও নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁর অভিনয়জীবনের ব্যাপ্তি যে শুধু বাংলা ছবির গণ্ডিতে আটকে ছিল না, এই কাজগুলিই তার প্রমাণ।

আরও পড়ুনঃ “রেগে গেলে কী করবে, কী বলে বসবে নিজেই জানে না!” “খেলতে গিয়ে দুর্নিবারের সংসার নিয়ে ওই কথাগুলো বলা ঠিক হয়নি ওর একদম!” “ওই বকাটা যথেষ্ট যুক্তিসংগত ছিল” বিগ বসের ঘরে সৌরভের বকুনিতে কান্নায় ভেঙে পড়তেই, মেয়ের আবেগপ্রবণ আচরণে চিন্তায় মুখ খুললেন রণিতা দাসের বাবা-মা! মেয়ের জেদ আর স্বভাব নিয়ে কী জানালেন তারা?

তবে হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন শুধু সাফল্য আর সম্মানের গল্প ছিল না। অভিনয়ের পাশাপাশি জীবনের নানা সময়ে ব্যক্তিগত আক্ষেপ ও অপূর্ণতার কথাও প্রকাশ্যে এনেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুষ্টিয়ার সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন অভিনেতা। তাঁর শৈশব, পড়াশোনা, নাটকের চর্চা এবং জীবনের সুখ-দুঃখের অনেক স্মৃতিই জড়িয়ে ছিল এই শহরের সঙ্গে। বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছা থাকলেও অনার্স পরীক্ষায় বসার সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপও ছিল তাঁর। জীবনের শেষ দিকে এসেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতার একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তাঁর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছিলেন পরিচালক সন্দীপ রায় এবং অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সন্দীপ রায়ের কথায়, এমন দক্ষ অভিনেতাকে হারানো বাংলা চলচ্চিত্রের অপূরণীয় ক্ষতি। আজ জন্মের শতবর্ষে দাঁড়িয়ে হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে করার অর্থ বাংলা সিনেমার সেই সমৃদ্ধ সময়কে ফিরে দেখা, যেখানে ছোট-বড় প্রতিটি চরিত্রই তাঁর অভিনয়ে হয়ে উঠত জীবন্ত।

You cannot copy content of this page