গোটা একটা প্রজন্ম যারা ‘এক আকাশের নীচে’ (Ek Akasher Niche) দেখে বড় হয়েছে, তাদের অনেকের কাছেই এই ধারাবাহিকটা শুধুমাত্র পুরোনো দিনের একটি টেলিভিশন সিরিয়াল নয়। বরং একটা সময়, একটা পরিবার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সংসার নিয়ে দেখা কিছু স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই নামটা। ২০০০ সালে শুরু হয়ে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলা রবি ওঝার এই ধারাবাহিকটি যেন সেই সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের একটা জীবন্ত ছবি হয়ে উঠেছিল। টেলিভিশনের সামনে পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসা, রবিবারের আলাদা একটা আমেজ আর পর্দার ওই বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া, সব মিলিয়ে ‘এক আকাশের নীচে’ একটা প্রজন্মের নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে আছে।
সেই বাড়ির কথা মনে পড়লেই প্রথমে মনে আসে আম্মার কথা। সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ে সেই সংসারের প্রধান মানুষটি ছিলেন তিন ছেলে অজয়, অতুল, আকাশ এবং তিন মেয়ে রাজ, মিনু ও ছুটকির মা। পরিবারের এতজন মানুষ, প্রত্যেকের আলাদা স্বভাব, আলাদা জীবনযাপন, আলাদা সমস্যা! তবু সবাইকে এক ছাদের নিচে ধরে রাখার অদৃশ্য ক্ষমতাটা ছিল এই পরিবারের অন্যতম আকর্ষণ। বড় খোকা অজয়ের চরিত্রে ছিলেন পার্থসারথি দেব, মেজ খোকা অতুলের ভূমিকায় রজতাভ দত্ত এবং ছোট খোকা তথা ডাক্তার আকাশের চরিত্রে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। বড় মেয়ে রাজ ছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক স্বনির্ভর নারী, কিন্তু বিয়ে না হওয়ার কারণে তাকেও কম কথা শুনতে হয়নি। মেজ মেয়ে মিনুর চরিত্রে অপরাজিতা আঢ্য এবং ছোট মেয়ে ছুটকির ভূমিকাতেও দর্শকরা আলাদা করে টান অনুভব করেছিলেন।
এই পরিবারের সম্পর্কের জটিলতা যেমন ছিল, তেমনই ছিল একেবারে চেনা ঘরোয়া উষ্ণতা। বড় বৌমা মাধবীর চরিত্রে চৈতি ঘোষাল, মেজ বৌমা সুদীপা বসু এবং পরে ইন্দ্রাণী বসুর অভিনয় সেই বাড়ির গল্পকে আরও পূর্ণতা দিয়েছিল। পরিবারের পরের প্রজন্মের চরিত্রগুলিও দর্শকদের কাছে কম প্রিয় ছিল না। বড় নাতনি পাখির চরিত্রে কণীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এমনভাবে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন যে আজও অনেকের কাছে তাঁর নাম শুনলে প্রথমেই ‘পাখি’র কথা মনে পড়ে। পাখির বোন টুসকির চরিত্রে ছিলেন সমতা দাস, আর গুবলু ও অনির মতো ছোটদের উপস্থিতিও সেই বাড়ির পরিবেশকে আরও জীবন্ত করে তুলেছিল। বাড়ির পরিচারক কানাইদা, অর্থাৎ কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়, এবং পরিচারিকা তরুদি, অর্থাৎ রুমকি চট্টোপাধ্যায়ও পরিবারের বাইরের মানুষ হয়েও যেন সেই সংসারেরই অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
তবে এত চরিত্রের ভিড়েও আকাশ আর নন্দিনীর গল্পটা আলাদা করে দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল। নন্দিনী চরিত্রে অদিতি চট্টোপাধ্যায় এবং আকাশের ভূমিকায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের জুটি তখন দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে খুব বড় কোনও নাটকীয়তার চেয়ে বেশি ছিল পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস আর একে অপরের পাশে থাকার সহজ স্বাভাবিকতা। অদিতি চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীতে বিয়ে করে বিদেশে চলে গেলে নন্দিনী চরিত্রে আসেন দেবলীনা দত্ত। চরিত্র বদলালেও নন্দিনী চরিত্রটির জনপ্রিয়তা কমেনি। দেবলীনার অভিনয়ও পরবর্তীকালে এই ধারাবাহিকের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হিসেবেই ‘এক আকাশের নীচে’ থেকে যায়।
আসলে এই ধারাবাহিকের সৌন্দর্য ছিল, এখানে কোনও একজন চরিত্রকে ঘিরে পুরো পৃথিবীটা তৈরি হয়নি। বাড়ির প্রতিটি মানুষই নিজের মতো করে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারও বিয়ে নিয়ে চিন্তা, কারও চাকরি, কারও সম্পর্কের টানাপোড়েন, কারও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছিল একটা বড় সংসারের গল্প। আকাশ-নন্দিনীর সম্পর্ক যেমন ভালোবাসার একটা নির্ভরযোগ্য ছবি দেখিয়েছিল, তেমনই পরিবারের অন্য সম্পর্কগুলো বুঝিয়েছিল যে একটা বাড়ি শুধু দেওয়াল আর ছাদ দিয়ে তৈরি হয় না। সেখানে মতের অমিল থাকবে, রাগ-অভিমান থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একে অপরের পাশে থাকার ইচ্ছেটাই একটা সংসারকে ঘর করে তোলে।
আজ এত বছর পরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা হয়তো সবাই সত্যি সত্যি তেমন সংসার করতে চেয়েছিলাম। হয়তো কেউ নন্দিনীর মতো শান্ত অথচ নিজের জায়গায় দৃঢ় হতে চেয়েছি, কেউ আবার আকাশের মতো একজন বোঝদার সঙ্গী চেয়েছি। কেউ আম্মার মতো একটা বড় পরিবারের কেন্দ্র হতে চেয়েছে, আবার কেউ পাখির মতো সেই বাড়ির ছোট্ট কোনও ঘরের আপন মানুষ হয়ে থাকতে চেয়েছে। তখন যৌথ পরিবার অনেক বেশি স্বাভাবিক ছিল, সন্ধ্যায় একসঙ্গে বসে গল্প করার সময়ও ছিল। এখন সময় বদলেছে, পরিবার ছোট হয়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, সম্পর্কের প্রকাশও অনেকটাই বদলে গিয়েছে। কিন্তু সেই পুরোনো বাড়িটার মতো একটা আপন নীড়, যেখানে মানুষ ভুল করেও ফিরে আসতে পারে, রাগ করেও পাশে বসতে পারে, সেই ইচ্ছেটা বোধহয় বদলায়নি।

আরও পড়ুনঃ “মা-মেয়ের ঝগড়া, অভিমান, নীরবতার মধ্যেও ভালোবাসা থাকে”, তিন প্রজন্মের সম্পর্কের গল্পে মুগ্ধ করলেন ত্রমিলা ভট্টাচার্য! “আজকের ব্যস্ত জীবনে সৌজন্য আর উদারতা হারিয়ে যাচ্ছে”, জীবনের কোন উপলব্ধি এমন বার্তা দিলেন অভিনেত্রী?
তাই ‘এক আকাশের নীচে’ আজও শুধুই একটি ধারাবাহিকের নাম নয়। এটা এমন এক সময়ের স্মৃতি, যখন টেলিভিশনের একটি পরিবার সত্যিই দর্শকের নিজের পরিবারের মতো হয়ে উঠতে পারত। আম্মা, আকাশ, নন্দিনী, রাজ, মিনু, ছুটকি, পাখি কিংবা কানাইদা, প্রতিটি চরিত্র যেন সেই পুরোনো সময়ের একটা করে দরজা খুলে দেয়। আজকের ব্যস্ত জীবনে দাঁড়িয়ে সেই দরজার ওপারে তাকালেই মনে হয়, কতটা সহজ ছিল তখনকার ভালোবাসা, কতটা স্বাভাবিক ছিল একে অপরের জন্য অপেক্ষা করা। হয়তো সেই কারণেই এখনও মনে হয় যে কিছু মেঘ, কিছু রোদ্দুর পেরিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে চায় সেই পুরোনো সময়ের কাছেই, এক আকাশের নীচে।






