বাংলা বিনোদন জগতে অভিনেতা মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের পরিচিতি ছিল বহুমুখী প্রতিভার শিল্পী হিসেবে। অভিনয়ের পাশাপাশি গান এবং সংগীত পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের ৭ মে ৭৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। তাঁর ছেলে দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়ও বাবার পথ অনুসরণ করে অভিনয় জগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। তবে বাবার পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে সহজে কেরিয়ারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে হাঁটেননি তিনি। সম্প্রতি ‘দাদাগিরি’র মঞ্চে উপস্থিত হয়ে নিজের অভিনয় জীবনের শুরুর দিকের কথা বলতে গিয়ে সেই লড়াইয়ের কথাই তুলে ধরেছেন দেবপ্রিয়। একইসঙ্গে জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এসেছিল বাবার কাছ থেকেই। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সেই পরামর্শ কীভাবে তাঁর কেরিয়ারের পথ তৈরি করেছিল, সেই স্মৃতিই ভাগ করে নেন অভিনেতা।
দেবপ্রিয়র কথায়, ছোটবেলা থেকেই তাঁর গানের তালিম চলত। মা-বাবা দুজনেই চেয়েছিলেন, তিনি গানকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিন। কিন্তু কলেজে পড়ার সময় তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় থিয়েটারের প্রতি। মঞ্চে প্রথম পা রাখার পরই বুঝতে পারেন, অভিনয়ই তাঁর জীবনের আসল ভালোবাসা। এরপর থেকেই অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে এই পথ যে সহজ হবে না, তা প্রথম থেকেই জানতেন দেবপ্রিয়। কারণ, অভিনেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বাবার কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন একেবারে স্পষ্ট বার্তা। মৃণাল মুখোপাধ্যায় ছেলেকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নিজের যোগ্যতায় কাজ পেতে হবে তাঁকে। কারও কাছে হাত পেতে কাজ চাওয়া কিংবা বাবার পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া তাঁর পথ হবে না। সেই শিক্ষাই পরবর্তী সময়ে দেবপ্রিয়র কেরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, “আমার অনেক ছোটবেলা থেকে গানের প্রশিক্ষণ চলছিল। মা, বাবা দুজনেই চেয়েছিল আমি গানটাকে নিই। কিন্তু কলেজে ওঠার পর আমি থিয়েটারে যোগ দিই। এবং প্রথম মঞ্চে পা রেখেই আমি বুঝে গেছিলাম যে আমার দ্বারা আর অন্যকিছু হবে না। এটা খুব সহজ ছিল না। আমার বাবা প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন আমি কিন্তু কারও সামনে হাত পাতব না যে তোমাকে লঞ্চ করুক বা তোমাকে কাজ দিক। খারাপ ভালো, ভুল ঠিক যা করতে হবে তোমাকে করতে হবে।” বাবার এই কথাগুলি যে তাঁর কাছে শুধুমাত্র উপদেশ ছিল না, বরং কাজের জগতে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র হয়ে উঠেছিল, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট। সেই সময় থেকে ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। ছোটপর্দায় কাজ করার পাশাপাশি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থাকেন দেবপ্রিয়। পরিচিত অভিনেতার ছেলে হওয়া সত্ত্বেও নিজের কাজের মাধ্যমেই পরিচিতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি।
অভিনয় জীবনের সেই শুরুর সময়েই দেবপ্রিয়র জীবনে বড় সুযোগ নিয়ে আসে নাট্যজগতের কাজ। ধীরে ধীরে নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে গিয়ে তিনি পৌঁছে যান পরিচালক অঞ্জন দত্তের কাছে। অঞ্জন দত্তের নাটক ‘থ্রি পেনি অপেরা’তে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এই নাটকটি তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। নাটকের মহড়া এবং মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। দেবপ্রিয়র কথায়, “তিলে, তিলে আসতে আসতে একটা জায়গা করতে করতে কোনোভাবে গিয়ে অঞ্জন দত্তের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাই। উনি নিজের একটি প্রোডাকশনে আমাকে সুযোগ দেন ‘তিন পেনি অপেরা’য়।” এই নাটকে কাজ করার সময়ই তাঁর অভিনয় নজরে পড়ে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের। নাটকের প্রিমিয়ারে দেবপ্রিয়র অভিনয় দেখে তাঁর কাজ ভালো লাগে সৃজিতের। এরপরই বড় পর্দায় কাজ করার সুযোগ আসে তাঁর কাছে।
আরও পড়ুনঃ “হিন্দু পরম্পরা, সংস্কৃতি ও আদর্শের পরিবারে বড় হওয়া মেয়ে কীভাবে তৃণমূলে গিয়েছিল, আজও অবাক হই!” “অনেক বড় করে ভাবতে হয়, যেটা আমরা পারি না!” তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েই কটাক্ষের মুখে কয়েল মল্লিক, পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থনে কী বার্তা শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের? “লাগাতার যা কমেডি দেখেছি, আপনি বিগ বসে যান” খোঁচা দিয়ে কেন এমন বললেন মমতাকে?
দেবপ্রিয় জানান, ‘থ্রি পেনি অপেরা’র প্রিমিয়ারে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। তাঁর অভিনয় দেখে সৃজিত তাঁকে নিজের পরিকল্পিত ছবি ‘জুলফিকার’-এ একটি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। অভিনেতার কথায়, “সেই সময় যখন আমি অভিনয় করছি, প্রিমিয়ার শুটে একজন পরিচালক নাম হয়ত অনেকে শুনে থাকতে পারে সৃজিত মুখার্জি, তিনি ‘তিন পেনি অপেরায়’ দেখেন। সৃজিতদা বলেন আমি ‘জুলফিকর’ বলে একটা ছবি প্ল্যান করছি। তুমি একটা চরিত্র অভিনয় করো আমার ভালো লাগবে। ওখানেই আমার একটা বড় মাপের প্রজেক্টের সাথে কাজ করা হয়।” এভাবেই থিয়েটারের মঞ্চ থেকে বড় পর্দায় পৌঁছনোর পথ তৈরি হয় তাঁর। পরবর্তী সময়ে ‘ইয়েতি অভিযান’, ‘মিতিন মাসি’সহ একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন দেবপ্রিয়। টেলিভিশন এবং ওয়েব সিরিজেও নিজের অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। বাবার পরিচয়কে ভরসা না করে নিজের পরিশ্রমে কেরিয়ার গড়ার যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন অভিনেতা।






