টলিউডের পরিচিত মুখ ইন্দ্রাণী হালদার বর্তমানে রুপোলি পর্দা এবং টলিপাড়ার ঝলমলে অনুষ্ঠান থেকে অনেকটাই দূরে। তবে যাত্রা, থিয়েটার এবং মাচা অনুষ্ঠানে এখনও নিয়মিত দেখা যায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেত্রীকে। কয়েক বছর আগেই অবশ্য নিজেই মূলধারার স্পটলাইট থেকে কিছুটা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানেও একসময় সক্রিয় ছিলেন ইন্দ্রাণী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত ছিলেন তিনি। গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতার অনুরোধে তৃণমূলের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রচারেও অংশ নিয়েছিলেন অভিনেত্রী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং নিজের ক্ষোভের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন ইন্দ্রাণী।
তৃণমূলের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইন্দ্রাণী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি বিনামূল্যে প্রচার করেননি। একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে যেভাবে মাচা অনুষ্ঠানে পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করেন, প্রচারেও সেভাবেই গিয়েছিলেন বলে দাবি তাঁর। অভিনেত্রীর কথায়, “আমি প্রচার করেছি ফ্রিতে নয়। আমি যেরকম মাচা করতে যাই, আমি কিন্তু পয়সা নিয়ে একদম প্রোগ্রাম করার মতন গিয়েছি। কারণ এটা আমার পেশা। আমার বর বলেছিল যাওয়ার কী দরকার? আমি বলেছিলাম, আমাকে টাকা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আমি কেন যাব না?” অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচার করলেও সেটিকে নিজের পেশার অংশ হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা থাকলেও দলের কাছ থেকে বিশেষ কোনও সুবিধা না পাওয়ার আক্ষেপও এবার প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী।
ইন্দ্রাণীর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং একাধিকবার তাঁকে সাংসদ কিংবা বিধায়ক করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মমতাকে দোষারোপ করতে চাননি অভিনেত্রী। তবে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে কিছু পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। ইন্দ্রাণীর কথায়, “আমার চেয়ে অনেক জুনিয়র মেয়েরা এমপি, এমএলএ হয়ে গেল। দিদি আমাকে বলেছিলেন রাজ্যসভা বা বিধানসভায় পাঠাবেন, কিন্তু কোনও কারণে হয়তো উনি তা করে উঠতে পারেননি। আমি উনাকে দোষ দেব না, তবে দল থেকে আমি বলতে গেলে কিছুই পাইনি।” ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পরেও নিজের জায়গা তৈরি না হওয়া নিয়ে একটা আক্ষেপ যে তাঁর মনে রয়েছে, তা তাঁর কথাতেই প্রকাশ পেয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারের অভিজ্ঞতা নিয়েও বিস্ফোরক দাবি করেছেন ইন্দ্রাণী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যে সমস্ত এলাকায় তাঁকে তৃণমূলের হয়ে প্রচারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজেরই ধারণা ছিল। অভিনেত্রী দাবি করেন, সেই আসনগুলিতে তৃণমূলের জয়ের সম্ভাবনা তিনি দেখেননি। তবুও তাঁকে সেখানে প্রচারে পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। ইন্দ্রাণীর কথায়, “আমি জানতাম আমাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেখানে তৃণমূল জিতবে না। তাও আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।” তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই নির্বাচনী প্রচারে তাঁর ভূমিকা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে, তৃণমূলের হয়ে এতটা সক্রিয়ভাবে প্রচার করার পরও দল থেকে কিছু না পাওয়ার যে অভিমান তিনি প্রকাশ করেছেন, সেটিও নজর কেড়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও ইন্দ্রাণীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা থামেনি। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জেলায় যাত্রা করতে গিয়েছিলেন তিনি। নতুন সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টও করেছিলেন অভিনেত্রী। সেই পোস্ট ঘিরে নেটিজেনদের একাংশের কটাক্ষের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তবে সেই সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ ইন্দ্রাণী। তাঁর বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে নয়, সৌজন্যতার কারণেই তিনি নতুন সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর সঙ্গে তাঁর পুরনো বন্ধুত্বের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাই আগামী দিনে তাঁদের পক্ষ থেকে কোনও অনুষ্ঠানে ডাক এলে সেখানে যেতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই বলেও স্পষ্ট করেছেন অভিনেত্রী।
আরও পড়ুনঃ “ভণ্ডামি শেষ পর্যায়ে যাকে বলে… এখনই ওইগুলো সব ডিলিট করো, উনি আমার দাদা!” জিৎকে কটা’ক্ষ করায় নিজের ফ্যানদেরই কড়া দাওয়াই দেবের! প্রতিদ্বন্দ্বীতা নয় অন্তরে আছে সম্মান! মেগাস্টারের এই পদক্ষেপে মুগ্ধ নেটপাড়া, সৌজন্যের নজির টলিউডে!
সব মিলিয়ে ইন্দ্রাণী হালদারের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একাধিক অজানা দিক সামনে এসেছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর সঙ্গে পুরনো ঘনিষ্ঠতার কথা বলেছেন অভিনেত্রী, অন্যদিকে সাংসদ বা বিধায়ক হওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া নিয়ে নিজের আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তৃণমূলের হয়ে প্রচারের সময় পারিশ্রমিক নেওয়ার বিষয়টিও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন তিনি। কোন এলাকায় কেন তাঁকে পাঠানো হয়েছিল, সেই নির্বাচনী অভিজ্ঞতা নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন ইন্দ্রাণী। আবার রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারকে সৌজন্যবার্তা দেওয়ার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে ফের একবার চর্চায় উঠে এসেছে টলিউড এবং রাজনীতির যোগসূত্র।






