টেলিভিশনের পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। এক সময় ধারাবাহিক ও সিনেমার দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় নাম ছিল ‘কৌশানী রায়’ (Koushani Roy Sarkar)। কিন্তু কেরিয়ারের একেবারে ভাল সময়েই আচমকা অভিনয় জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এই অভিনেত্রী। বর্তমানে তিনি আর কৌশানী রায় নন, কৌশানী রায় সরকার। স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখন তাঁর ঠিকানা আমেরিকার টেক্সাস। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর সাম্প্রতিক ছবিও নজরে এসেছে। বহু বছর পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ঠিক কী কারণে অভিনয় ছেড়ে বিদেশে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জের মেয়ে কৌশানী খুব ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন তিনি। থিয়েটার থেকে ধীরে ধীরে টেলিভিশনের জগতে নিজের পরিচিতি তৈরি হয়। ‘এখানে আকাশ নীল’, ‘রোজগেরে গিন্নি’ এবং ‘কাদের কুলের বউ’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে কাজ করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন তিনি। আজিমগঞ্জেই বড় হওয়া কৌশানীর পরিচয় ছিল সঞ্চালক মীর আফসার আলির সঙ্গে। একই এলাকার ছেলে গায়ক অরিজিৎ সিংয়ের সঙ্গেও ছোটবেলা থেকে পরিচয় ছিল তাঁর। কৌশানীর কথায়, বহু স্টেজ শোতে একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন তাঁরা। এছাড়াও কলকাতার বিশিষ্ট রেডিয়ো শিল্পী জগন্নাথ বসুর কাছে তিনি কণ্ঠস্বরের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
অভিনয়ের জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ব্যক্তিগত জীবনের একটি সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনকে অন্য পথে নিয়ে যায়। কৌশানী জানান, “জানেন, মাঝেমধ্যে খুব বোর ফিল করতাম। বাবা বিয়ে দিতে চাইত। আমার বাবার বন্ধুর ছেলের প্রেমে পড়ে যাই। বর্তমানে তিনিই আমার স্বামী। বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি চটপট। অভিনয়কেও আলবিদা জানিয়ে দিই। চলে যাই দুবাই।” তবে শুধুমাত্র বিয়েই নয়, অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পিছনে আরও একটি বড় কারণ ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, “আমি স্বর্ণযুগে কাজ শুরু করেছিলাম টেলিভিশনে। ধীরে-ধীরে দেখলাম, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। সে একটা বিশ্রী পরিস্থিতি।” তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে কাজ মানে সৃষ্টিশীলতা।
সেটা কখনওই রাজনীতি নয়। একটা সময়ের পর দেখলাম, মেকআপ রুমেও রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। শিল্পীরা শিল্পীদের এড়িয়ে যাচ্ছেন। দম আটকে গেল আমার।” সেই কারণেই ২০১৫ সালে অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দুবাই থেকে পরে আবু ধাবি, বাহরিন এবং শেষ পর্যন্ত টেক্সাসে স্থায়ী হয়েছেন কৌশানী। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলেও ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তাঁকে এখনও মনে রেখেছেন। অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় একবার দুবাইয়ে গিয়ে কৌশানীর বাড়িতেও ছিলেন। সেই সময় নাকি স্বস্তিকা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “সব ছেড়ে কী করে এত সুন্দর সংসার করছিস বল তো?” উত্তরে কৌশানী বলেছিলেন, “আসলে জীবনটাই একটা রঙ্গমঞ্চ।
জন্মের পর থেকে আমরা সকলে অভিনয়ই করে চলেছি। তাই আমার আক্ষেপ নেই। পেশাদার অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছাও নেই।” অন্যদিকে মীর আফসার আলিও কৌশানীকে স্মরণ করে বলেন, “কৌশানীকে অনেক বছর ধরেই চিনি। ওঁর কাজ যখন দেখতাম, খুব ভাল লাগত। ভীষণ ফোকাসড, ভীষণ ডেডিকেটেড এক শিল্পী।” তিনি আরও জানান, আজিমগঞ্জের মেয়ে হওয়ার কারণেও কৌশানীর প্রতি তাঁর আলাদা টান রয়েছে। বর্তমানে কৌশানীর জীবনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর সাত বছরের ছেলে রোদ্দুর। অটিজমে আক্রান্ত সন্তানকে ঘিরেই তাঁর দৈনন্দিন জীবন আবর্তিত হয়। এই প্রসঙ্গে কৌশানী বলেন, “আমাদের কাছে বাচ্চার এই পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। এটাকে আমরা নর্মালাইজ করে ফেলেছি।”
আরও পড়ুনঃ টলিউডে SIR! ‘আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে, এখনই সরে যান’ দুর্নী’তি ও টাকা দিয়ে কাজ পাওয়ার অভিযোগে কড়া অবস্থান পাপিয়া অধিকারীর! টলিউডে বড়সড় রদবদল, ফেডারেশনের ২৬ গিল্ডে ইতি! পরিচালকরাই এবার ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ’!
তবে ভারতে এখনও অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালির হৃদয়টা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই সব ফাঁপা বলে মনে হয় এখন।” টেক্সাসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধার প্রশংসা করে তিনি বলেন, “ওখানকার অন্য বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা অটিজমে আক্রান্ত বাচ্চাদের আপন করে নেন সহজেই।” কলকাতার পরিস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “আমার বাচ্চার সঙ্গে এখানে কেউ কি খেলতে পাঠাবে? বুকে হাত রেখে বলতে পারব কলকাতার শিক্ষিত লোকজন আমার ছেলেকে দেখে কটূক্তি করবে না?” তাই ভবিষ্যতে দেশে ফিরলেও কলকাতায় স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পরিকল্পনা নেই বলেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন এই অভিনেত্রী।






