বিনোদন জগৎ হোক বা সাধারণ মানুষের জীবন কিছু কিছু দাম্পত্য সম্পর্ক এতটাই গভীর ও পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল হয় যে, সেই গল্প শুনলে অনেক সময় তা কল্পনার জগতের কোনও গল্প বলে মনে হয়। দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে হারানোর পর সেই শূন্যতা কতটা গভীর হতে পারে, তা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানিয়েছেন অভিনেত্রী সুভদ্রা মুখোপাধ্যায়। স্বামী ফিরোজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, একসঙ্গে কাটানো শেষ সময় এবং আচমকা ঘটে যাওয়া সেই মৃত্যুর স্মৃতি আজও তাঁকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। স্বামীর শেষ মুহূর্তের আগে তাঁর সঙ্গে কাটানো কয়েকটি সাধারণ মুহূর্তই যে পরবর্তীতে সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা হয়তো সেদিন ভাবেননি অভিনেত্রী।
২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ছোট পর্দার জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেত্রী সুভদ্রা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী ফিরোজ আকস্মিকভাবে মারা যান। কর্মসূত্রে মুম্বইয়ে থাকা ফিরোজ ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে জানা যায়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছরের বেশি। মৃত্যুর আগের দিন কলকাতা থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁদের ছেলে বাড়ি ফিরেছিলেন এবং ২৯ সেপ্টেম্বর পরিবারের সকলে একসঙ্গে ছিলেন। সেই রাতেও খাওয়াদাওয়া, গান শোনা এবং গল্প করে স্বাভাবিকভাবেই সময় কেটেছিল। কিন্তু পরদিন সকালেই বদলে যায় সবকিছু। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সুভদ্রা। প্রায় এক বছর অভিনয় থেকে দূরে থাকার পর সম্প্রতি মেয়ের উৎসাহেই আবার ছোটপর্দায় ফিরেছেন তিনি।
ফিরোজের সঙ্গে কাটানো শেষ রাতের কথা বলতে গিয়ে এখনও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সুভদ্রা। তিনি জানান, ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁরা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেছিলেন, গান শুনেছিলেন এবং গল্পও করেছিলেন। সেই রাতে স্বামীকে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছিলেন তিনি। এখন সেটাই তাঁর সারাজীবনের অন্যতম বড় আফসোস। অভিনেত্রীর মনে হয়, যদি সেদিন তাঁকে ঘুমাতে না বলতেন, তাহলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ গল্প করা যেত। পরদিন সকালেও সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। প্রায় ন’টার সময় চা দেওয়া হয়েছিল। ফিরোজ জানিয়েছিলেন, একটু পরে চা খাবেন। সেই সময় সুভদ্রার একটি ফোন আসে এবং তিনি ঘরের বাইরে গিয়ে ফোনে কথা বলতে থাকেন।
আরও পড়ুন: “বাপিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি…মধুবালার মতো সুন্দরী মহিলার প্রেমে পড়লে দোষের কী! কিন্তু মা আর বাপির সম্পর্কটা ভে’ঙেছিল…” কিশোর কুমারের জীবনের অজানা অধ্যায় প্রকাশ্যে আনলেন প্রথম স্ত্রীর কন্যা তথা সঙ্গীতশিল্পী শ্রমণা গুহঠাকুরতার! জানালেন, মধুবালার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে নয়, রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে গায়কের বি’চ্ছেদের নেপথ্যে কী ছিল আসল কারণ?
ফোনে কথা বলা শেষ করে ঘরের দিকে তাকিয়ে সুভদ্রার মনে হয়েছিল, এতক্ষণেও স্বামী ঘুম থেকে ওঠেননি। তিনি ভাবছিলেন, এবার তাঁকে উঠিয়ে দিতে হবে, কারণ তাঁর ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই স্বাভাবিক ভাবনাই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়। অভিনেত্রীর কথায়, ফিরোজ কখনও লাগেজ বহন করতে পছন্দ করতেন না। অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁকেই কফিনে করে নিয়ে যেতে হবে এমনটা তিনি কোনওদিন কল্পনাও করেননি। স্বামীর মৃত্যুর পর বিমানযাত্রার সময়ও এক অদ্ভুত অনুভূতির কথা জানিয়েছেন সুভদ্রা। তাঁর মনে হয়েছিল, যেন ফিরোজ পিছন থেকে তাঁকে ধরে আছেন এবং বারবার ‘ভেরি সরি’ বলছেন। এই স্মৃতি এখনও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।

স্বামীকে হারানোর পর সেই শোক থেকে বেরিয়ে আসা সুভদ্রার পক্ষে সহজ ছিল না। তাঁর কথায়, মেয়ের উপস্থিতি ও সাহস না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারত। দীর্ঘ এক বছর অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়ের উৎসাহ তাঁকে আবার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার সাহস দেয়। সম্প্রতি তাই ছোটপর্দায় অভিনয়ে ফিরেছেন সুভদ্রা। পর্দায় তাঁকে আবার দেখা গেলেও ফিরোজকে হারানোর সেই ক্ষত যে এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি, তাঁর স্মৃতিচারণেই তার স্পষ্ট আভাস মেলে। জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষকে হারানোর পরও সন্তানদের জন্য নিজেকে সামলে নিয়ে নতুন করে পথ চলার চেষ্টা করছেন অভিনেত্রী।






