একই দিনে জন্ম, সম্পর্কও যেন মা-মেয়ের! ছোট্ট চুমকিকে মেয়ের মতো আগলে রাখতেন লিলি, আউটডোরে শাসন থেকে মেকআপ রুমে তাস খেলা, পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে আবেগপ্রবণ দেবশ্রী, ‘লিলিমাসি’র স্নেহে আজও ভাসেন তিনি? জন্মদিনে একে অপরের জীবনের অজানা অধ্যায় ভাগ করলেন দুই প্রজন্মের অভিনেত্রী?

বাংলা অভিনয় জগতের দুই প্রজন্মের দুই জনপ্রিয় অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী এবং দেবশ্রী রায়। প্রজন্মের ব্যবধান থাকলেও তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে সেই দূরত্ব কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং কাজের সূত্রে তৈরি হওয়া সম্পর্ক ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছে গভীর স্নেহ ও বন্ধুত্বে। ৮ অগস্ট দু’জনেরই জন্মদিন। ‘সুন্দর বৌ’, ‘তিস্তা’ এবং ‘ফেরারি ফৌজ’-এর মতো ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা। জন্মদিনে পুরনো দিনের স্মৃতি ফিরে দেখেছেন দুই অভিনেত্রী। একইসঙ্গে একে অপরকে জানিয়েছেন জন্মদিনের শুভেচ্ছাও। লিলি চক্রবর্তী সাধারণত নিজের বাড়িতেই জন্মদিন কাটান। কাছেই থাকেন তাঁর এক ভাইঝি, যিনি প্রতি বছর নিয়ম করে অভিনেত্রীর জন্য পায়েস নিয়ে আসেন।

দেবশ্রী রায়ের জন্মদিনের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলে লিলি চক্রবর্তী অনুজ অভিনেত্রীকে একরাশ শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানান। স্নেহভরে দেবশ্রীকে তিনি ‘চুমকি’ বলে ডাকেন। পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে লিলি জানান, ছোটবেলায় অভিনয় জগতে আসার পর দেবশ্রী তাঁর সঙ্গে মেকআপ ঘরেই থাকতেন। তাঁদের সম্পর্কটা তখন অনেকটা পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছিল। একসঙ্গে বসে গল্প করা, পুরনো দিনের কথা বলা এবং নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলত। কাজের ক্ষেত্রে কোনও কিছু বুঝতে সমস্যা হলে দেবশ্রীকে বুঝিয়ে দিতেন লিলি। তাঁর কথা মন দিয়ে শুনতেন দেবশ্রীও। লিলির মতে, পরবর্তীকালে অত্যন্ত ভালো কাজ করেছেন দেবশ্রী। বড় অভিনেত্রী হয়ে ওঠার পরেও তাঁর মধ্যে কোনও অহঙ্কার দেখেননি তিনি। এখন বেছে বেছে কাজ করার যে সিদ্ধান্ত দেবশ্রী নিয়েছেন, সেটিকেও যথেষ্ট ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন লিলি।

অন্যদিকে দেবশ্রী রায়ের কাছে লিলি চক্রবর্তী শুধুই সহকর্মী নন, তিনি ‘লিলিমাসি’। লিলির অভিনীত ‘অচানক’ ছবিটি দেবশ্রীর অন্যতম পছন্দের ছবি। বিনোদ খান্নার সঙ্গে সেই ছবিতে লিলির অভিনয় দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। দেবশ্রী জানান, ছোটবেলায় তাঁর মা প্রথম তাঁকে লিলির নাটক দেখতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতেও একাধিকবার নাটক দেখতে গিয়েছেন তিনি। তবে যখন নিজে লিলির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান, তখন তাঁর কাছ থেকে একেবারে মায়ের মতো স্নেহ পেয়েছিলেন। অভিনয় নিয়ে নানা পরামর্শও দিয়েছেন লিলি, যা নিজের কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন দেবশ্রী। শুধু অভিনয় নয়, লিলির পান খাওয়ার অভ্যাসও ছোট্ট দেবশ্রীকে আকৃষ্ট করত। তিনিও আবদার করে লিলির সঙ্গে পান খেতে চাইতেন।

পুরনো দিনের শুটিংয়ের স্মৃতিও দুই অভিনেত্রীর কথায় বারবার ফিরে এসেছে। তখনকার দিনে এখনকার মতো আলাদা আলাদা মেকআপ ভ্যানের চল ছিল না। অভিনেতা অভিনেত্রীরা অনেক সময় একই মেকআপ ঘরে বসতেন এবং সেখানেই চলত আড্ডা ও খাওয়াদাওয়া। লিলি জানান, ছোটবেলায় দেবশ্রী তাঁর কাছে নানা আবদার করতেন এবং পুরনো দিনের গল্প শুনতে চাইতেন। এমনকি তাঁর আবদারে মেকআপ ঘরে বসে তাসও খেলেছেন তাঁরা। একবার তপন থিয়েটারে দেবশ্রী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং লিলি চক্রবর্তীর নাটক দেখতে এসেছিলেন। দেবশ্রীও মনে করেন, সেই সময়ের শিল্পীদের মধ্যে একে অপরকে আগলে রাখার একটা আলাদা সম্পর্ক ছিল। আউটডোর শুটিংয়ে গেলে লিলি তাঁকে যেমন স্নেহ করতেন, তেমনই প্রয়োজন হলে শাসনও করতেন। সেই দিনগুলিই এখন খুব মনে পড়ে তাঁর।

একই দিনে জন্মদিন হলেও শুটিংয়ের মধ্যে তাঁদের জন্মদিন কখনও পড়েনি বলে জানান লিলি চক্রবর্তী। আগে জন্মদিনে কাজ করতেন এবং তাঁর স্বামী বিশেষভাবে দিনটি পালন করতেন। এখন আর সেভাবে উদ্‌যাপন করেন না তিনি। বাড়িতে কেউ এলে তাঁর সঙ্গে গল্প করেই দিনটা কেটে যায়। তবে আগের মতো অনেক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় কিছুটা খারাপও লাগে তাঁর। দেবশ্রীর মতে, ব্যক্তি হিসেবে লিলিমাসি অত্যন্ত নরম মনের মানুষ। নিজেকেও ভিতর থেকে নরম মানুষ বলেই মনে করেন দেবশ্রী। তাঁর কথায়, শিল্পীরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হন। একই দিনে জন্মদিন বলে দু’জনের চরিত্র একরকম কি না তিনি বলতে পারবেন না। তবে তাঁর বিশ্বাস, অগস্ট মাসে জন্মানো শিল্পীরা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং নিজেদের কাজের প্রতি সৎ থেকে নিজেদের জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুনঃ “স্বরূপ বিশ্বাস আমার শ্লী*লতাহা’নি করেননি, ওঁর সঙ্গে কোনওদিন সামনাসামনি কথাই হয়নি!” “আমি ‘ভয় আউট ভরসা ইন’-দের প্ররোচনায় পা দিয়ে কেস করেছিলাম…উনি অকারণে জেল খাটছেন, কিছু না করেও বদনাম হয়েছে” হঠাৎ মামলা তুলে নিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি রূপসজ্জাশিল্পী সিমরন পালের!

বর্তমানে দু’জনেই বেছে বেছে কাজ করেন এবং আগের মতো নিয়মিত যোগাযোগও নেই তাঁদের। তবুও দেখা হলেই পুরনো সেই কথাটি ফিরে আসে, ‘আমরা কিন্তু একই দিনে জন্মেছি।’ গত বছর অক্টোবর মাসে একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা হয়েছিল। সেখানে জীবনকৃতি সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন লিলি চক্রবর্তী এবং দেবশ্রীই তাঁর হাতে সেই সম্মান তুলে দিয়েছিলেন। এখনও ধারাবাহিক ও ছবিতে কাজ করে চলেছেন লিলি, যা অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসারই প্রমাণ বলে মনে করেন দেবশ্রী। তবে নিজের জন্মদিন এখন আর উদ্‌যাপন করেন না দেবশ্রী। ২০২২ সালে তাঁর মা, ২০২৪ সালে বড়দি এবং ২০২৫ সালে সেজদি মারা যাওয়ার পর জন্মদিনের আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে তাঁর কাছে। মায়ের বানানো পায়েসের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তাই এই দিনে শহর ছেড়ে দূরে চলে যান তিনি। সঙ্গে থাকেন এক ভাই এবং দুই বন্ধু। তাঁদের সঙ্গে গল্প করে কিছুটা সময় ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। আর জন্মদিনে লিলিমাসির জন্য দেবশ্রীর একটাই প্রার্থনা, তিনি যেন সুস্থ, ভালো এবং আনন্দে থাকেন।

You cannot copy content of this page