যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সাম্প্রতিক ছাত্র সংঘাতের ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা। এবার সেই প্রসঙ্গেই সরব হলেন অভিনেত্রী ও পরিচালক মানসী সিনহা। রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী ভাবধারার সমর্থক হিসেবে পরিচিত মানসী এবার সরাসরি শুভেন্দু অধিকারীকে উদ্দেশ করে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের একটি ছবিও পোস্ট করেন তিনি। সেই ছবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকচিহ্নের উপর জুতো পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবিভিপির এক সমর্থককে। এই ছবিকে সামনে রেখেই রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং শাসকদলের দায়িত্ব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন মানসী।
মানসী তাঁর খোলা চিঠিতে লেখেন, “মাননীয়, আমি জানি এই ভয়াবহ ছবিটা আপনি দেখেছেন। আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, আপনি নিশ্চিত জানেন এটা AI নির্মিত নয়।” এরপরই শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি লেখেন, “আপনি এও শুনেছেন, আপনার বিধায়িকা সারারাত সেই তাণ্ডবেরই হুমকি দিচ্ছেন…” মানসীর বক্তব্য, যে ধরনের তাণ্ডব থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার আশ্বাস দিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল, সেই একই ধরনের হুমকি যদি সামনে আসে, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তিনি মনে করিয়ে দেন, সাধারণ মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের উপরেই থাকে। নিজেকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি রাজ্য সরকারের কাছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। যাদবপুরের ঘটনা ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন বলেই তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে। তবে তাঁর এই পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক মহল এবং সোশ্যাল মিডিয়াতেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চিঠিতে রাজ্যের দায়িত্বের প্রসঙ্গ আরও স্পষ্ট করে মানসী লেখেন, “মাননীয়, আপনি এ রাজ্যের সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছেন। আপনি আমার মত সাধারণদের দ্বায়িত্ব নিয়েছেন।” তিনি আরও বলেন, “গত ক’বছর আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারিনি। আপনি সেই নিশ্চিন্তির দ্বায়িত্ব নিয়েছেন।” এরপর খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলিও উল্লেখ করেন তিনি। মানসীর কথায়, “আমাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, নিরাপত্তা সব কিছুর দ্বায়িত্ব নিয়েছেন।” একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকার কথাও জানিয়েছেন। চিঠির শেষে তাঁর আবেদন, “আমরা আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। আশা রাখি, আপনার সিদ্ধান্ত আমাদের ভরসা দেবে।” সন্তানদের ভবিষ্যৎ যাতে নির্ভয়ে সরকারের হাতে তুলে দেওয়া যায়, সেই প্রত্যাশাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় বাম ছাত্র সংগঠন এবং এবিভিপির সংঘাত নিয়ে বিজেপির তরফেও ইতিমধ্যে অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, দলের নিজস্ব কোনও ছাত্র সংগঠন নেই। তিনি বলেন, “বিজেপির কোনও ছাত্র সংগঠন নেই। যাদের কথা বলা হচ্ছে, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (AVBP) তারা বিজেপি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না।” এই ঘটনার বিষয়ে বাকি বক্তব্য শিক্ষামন্ত্রী এবং পুলিশমন্ত্রী দেবেন বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ যাদবপুরের ঘটনায় এবিভিপির ভূমিকার সঙ্গে দলের সরাসরি যোগ নেই, এমনটাই বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মানসীর খোলা চিঠি প্রকাশ্যে আসে। চিঠি প্রকাশের পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা মন্তব্য শুরু হয়। বামপন্থী সমর্থক হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণে তাঁকে উদ্দেশ করে একাংশের নেটিজেন কটাক্ষও করেন।
এক নেটিজেন মানসীর রাজনৈতিক অবস্থানকে সামনে রেখে লেখেন, “আপনি যে রাজনৈতিক দলের সমর্থক তাকে মহাশূন্যে পাঠাতে রাজ্যের ৪৬% মানুষ রাষ্ট্রবাদী সরকারকে ক্ষমতায় এনেছেন, আপনি যেই শতাংশের মধ্যে পড়েন না। আমি বা আমরা নিশ্চিত।” এই মন্তব্যেরও জবাব দেন অভিনেত্রী। মানসী প্রশ্ন তোলেন, “আপনার মতে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমর্থন থাকলে তিনি কোনভাবেই আর সাধারণ নন?” এরপর ব্যঙ্গের সুরে তিনি লেখেন, “এইরে! তাহলে তো চতুর্দিকের অনেকটাই অসাধারণে ভরে গেছে, এটাই মানতে হবে! তাহলে তো আপনিও অসাধারণ!” তবে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। মানসীর কথায়, “কিন্তু ভাই, আমার সন্তানদের দায়িত্ব খামোকা সংঘের উপর দেব কেন? কি কারণে??” তিনি আরও প্রশ্ন করেন, “তাদেরকেও যদি এই ‘উত্তেজিত ভাল’ ছাত্রদের মত তৈরি করে দেয়? না না, এতটা রিস্ক নেওয়া যাবে না ভাই।”
আরও পড়ুনঃ নায়িকা নন, খলনায়িকা হয়েই বছরের পর বছর দর্শকের মনে রাজত্ব! প্রয়াত রীতা কয়রাল, ডলি বসু, ঊষসী থেকে স্বাগত ও মৌমিতা, পর্দায় এমন ‘নেগেটিভ’ চরিত্রে নজর কেড়েছেন যে আজও তাঁদের ভুলতে পারেননি দর্শক! তাহলে কি নায়িকার জনপ্রিয়তার থেকেও খলনায়িকার প্রভাব বেশি? আপনাদের কোন অভিনেত্রীর কোন চরিত্রটি আজও দাগ কেটে আছে মনে?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য এবং এবিভিপিকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই মানসী সিনহার এই পোস্ট নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নিজের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি আগেও প্রকাশ্যে কথা বলেছেন এবং এবারও সেই অবস্থান গোপন করেননি। তবে তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে যাদবপুরের গেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকের উপর জুতো পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবিটি তাঁকে যে ভাবে নাড়া দিয়েছে, তা তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনও নাগরিকের সাধারণ মানুষের অধিকার বা উদ্বেগ প্রকাশের জায়গা নষ্ট হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য এবং পালটা জবাব ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। যাদবপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই মানসীর এই খোলা চিঠি নিয়ে এখন নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।






