৭ই মার্চের সেই ম’র্মান্তিক দুর্ঘ’টনা, থামিয়ে দিয়েছিল কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের কন্ঠ! বাউলদের আখড়ায় গান শেখা থেকে ‘দোহার’ গঠন, বাংলার লোকসঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছানোর নিরলস সাধকের স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি!

কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা চলে গেলেও তাঁদের কাজ, ভাবনা আর সৃষ্টি থেকে যায় দীর্ঘদিন। সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সুর, শব্দ আর উদ্যোগ মানুষের মনে বারবার ফিরে আসে। বাংলা লোকসঙ্গীতের জগতে এমনই এক নাম ‘কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য’ (Kalika Prasad Bhattacharya)। তাঁর উপস্থিতি আজ আর নেই, কিন্তু লোকগানকে নতুনভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে কাজ তিনি করেছিলেন, তা এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গবেষণা, সংগ্রহ আর সঙ্গীতচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, সেটি আজও বাংলা লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

অসমের শিলচরে জন্ম নেওয়া কালিকাপ্রসাদের ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে পড়াশোনার জন্য তিনি চলে আসেন কলকাতায় এবং ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রজীবনেই তাঁর সংগীতচর্চা আরও বিস্তৃত হয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের উপর তাঁর দখল ছিল, তবে তাঁর মন সবচেয়ে বেশি টানত বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা লোকগানের দিকে। সেই টানই তাঁকে ধীরে ধীরে লোকসংস্কৃতির গভীর অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, লোকগান তাঁর কাছে শুধু গাওয়ার বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল জানার এবং বোঝার ক্ষেত্র। বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তিনি গান সংগ্রহ করতেন, মানুষের কাছ থেকে শুনতেন বহু পুরনো সুর ও গল্প। লোকসঙ্গীতের খোঁজে তিনি একাধিকবার গিয়েছেন বাংলাদেশেও! বাউল আর ফকিরদের আখড়ায় সময় কাটিয়ে তিনি এই ধারার গান, দর্শন এবং জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতচর্চাকে আরও গভীর ও সমৃদ্ধ করে তোলে।

এই আগ্রহ থেকেই পরে তিনি গড়ে তোলেন জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতের দল ‘দোহার’। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া এই দলটি মানুষের কাছে অল্প সময়েই বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। দোহারের পরিবেশনে লোকগান যেন সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় শ্রোতাদের সামনে আসে। যেখানে গ্রামীণ সুর, লোকায়ত বাদ্যযন্ত্র এবং সহজ সরল গানের ধারা বিশেষ গুরুত্ব পেত। তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলার অনেক প্রায় হারিয়ে যাওয়া গান আবার মানুষের কানে পৌঁছতে শুরু করে এবং দেশ-বিদেশে লোকসঙ্গীতের নতুন শ্রোতা তৈরি হয়।

আরও পড়ুনঃ “মায়ের হাতে মাখা ভাতের আলাদাই স্বাদ, জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখছি…আজও আমি ছোট্ট ছেলেটাই!” বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে, মায়ের হাতে আইবুড়োভাত খেয়ে আবেগঘন পোস্ট সুকান্ত কুণ্ডুর! বিশেষ দিনে পাতে ছিল কী কী?

তবে, এই পথচলা হঠাৎই থেমে যায় ২০১৭ সালের ৭ মার্চ। একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে গুড়াপ এলাকায় সড়ক দুর্ঘ’টনায় প্রাণ হারান কালিকাপ্রসাদ। সেই দুর্ঘটনায় দোহার দলের আরও কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছিলেন, যদিও পরে তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু কালিকাপ্রসাদের অকাল প্রয়া’ণ বাংলা লোকসঙ্গীতের জগতে এক বড় শূন্যতা তৈরি করে। তবু তাঁর সংগৃহীত গান, গবেষণার কাজ এবং লোকসংস্কৃতিকে নতুন করে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা, সেগুলোই আজ তাঁর স্মৃতিকে জীবন্ত করে রেখেছে।

You cannot copy content of this page