মঞ্চে শিল্পী এবং আয়োজকদের সম্পর্ক বরাবরই এক সূক্ষ্ম সমীকরণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। সম্মান, দায়িত্ব আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভারসাম্য ঠিক না থাকলেই সমস্যা তৈরি হয়। বনগাঁর ওই অনুষ্ঠানে ঠিক তেমনই এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সামনে আসে, যেখানে অভিনেত্রী ‘মিমি চক্রবর্তী’ (Mimi Chakraborty) নিজেকে অসম্মানিত বলে মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, গান চলাকালীনই মঞ্চে উঠে তাঁকে নেমে যেতে বলা হয়েছিল। শিল্পী হিসেবে এই আচরণকে তিনি অপমানজনক বলেই দেখেছেন এবং সেই কারণেই বিষয়টি শুধুই ব্যক্তিগত ক্ষোভে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনি পথেও এগোন।
অন্যদিকে, আয়োজক পক্ষের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, সময়মতো অনুষ্ঠানস্থলে না পৌঁছনোর কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়। পুলিশি অনুমতি ছিল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত, তারপরে অনুষ্ঠান চালানো সম্ভব ছিল না। গ্রামীণ এলাকায় রাত বাড়লে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক ঝুঁকি বাড়ে, এই যুক্তিতেই তাঁরা দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করার অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান। কিন্তু এই দুই বিপরীত দাবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে, শিল্পীর সম্মান আর প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার সীমারেখা ঠিক কোথায়?
ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়ে যখন উদ্যোক্তা তনয় শাস্ত্রীকে হে’নস্থার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা থাকায় এলাকায় কড়া নিয়ম ছিল এবং তিনি কোনওভাবেই শিল্পীকে অপমান করতে চাননি। বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু গ্রেফতারির পর থেকেই বিষয়টি শুধুই একটি অনুষ্ঠানঘটিত বিতর্ক না থেকে বড় সামাজিক আলোচনায় পরিণত হয়, যেখানে বিনোদন জগতের বহু মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন।
এই প্রেক্ষিতেই স্পষ্ট এবং কড়া ভাষায় মুখ খোলেন টলিউডের পরিচিত খলনায়ক ‘সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়’ (Sumit Ganguly)। প্রায় দুই দশকের অভিনয় জীবনে মঞ্চ আর পর্দা দুই জায়গাতেই কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিল্পীর মর্যাদা নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তাঁর বক্তব্যে কোনও অতিরিক্ত ক্ষোভ না থাকলেও, শিল্পীর সম্মান নিয়ে আপস না করার দৃঢ়তা স্পষ্ট ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, “কে কী করেছে জানি না, কিন্তু আমিও মঞ্চশিল্পী হিসাবে যাই অনুষ্ঠান করতে। আমাকে যদি অনুষ্ঠান চলাকালীন কোনও লোক এসে বলতো তুমি নেমে যাও এক্ষুনি!
আমি প্রথমেই তার কাছ থেকে মাইক নিয়ে দর্শকদের প্রশ্ন করতাম তাদের কি মত? তারপর সেখানে কোনও প্রশাসনিক আধিকারিক আছে কিনা সেটার খোঁজ করে প্রশ্ন করতাম সময়সীমা বা অসুবিধা হচ্ছে কি না। সবাই যদি নেমে যেতে বলে, আমি তক্ষুনি মাথা নিচু করে নেমে যাব। নাহলে কেউ আমাকে নামাতে পারবে না! যদি প্রশাসনিক নিয়মের জন্য বন্ধ করতে হয় অনুষ্ঠান, তাহলে সমস্ত কিছু গোছানো পর্যন্ত ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকব। তবু নেমে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই! টাকা দিয়ে এনেছেন মানেই একজন শিল্পীকে আপনি মঞ্চটা ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছেন
আরও পড়ুনঃ “বন্ধুত্বে হয়, ভালোবাসায় ‘তুই-তোকারি’ চলে না…সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে করে দেয়!” “একটু মজার জন্য যেটা করছ, সেটা সম্পর্ককে ভঙ্গুর করছে!” প্রেমে সম্মানের বিকল্প হতে পারে না, গভীর সংযোগ না থাকলে সম্পর্ক টেকে না! নতুন প্রজন্মকে কী সতর্কবার্তা শোনাচ্ছেন দীপঙ্কর দে?
তাই তার অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোনভাবেই অনুমতি ছাড়া মঞ্চে উঠতে পারেন না বা তাকে বন্ধ করার আদেশ করতে পারেন না! মিমির জায়গায় আমি থাকলে বলতাম যে, এই মঞ্চটা এখন আমার, তাই ইউ জাস্ট গেট আউট!” তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে শিল্পীর সম্মান বনাম আয়োজকদের দায়িত্বের প্রশ্নটি। তাঁর বক্তব্যে মিমির পাশে দাঁড়ানোর বার্তাই শুধু নয়, বরং মঞ্চশিল্পীদের দীর্ঘদিনের অব্যক্ত ক্ষোভও যেন উঠে এসেছে। এই বিতর্ক হয়তো সময়ের সঙ্গে থেমে যাবে, কিন্তু সীমারেখা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠে এল, তা নিঃসন্দেহে ভেবে দেখার মতো।






