অভিনেতা তথা পরিচালক তথাগত মুখার্জি শুধু বিনোদন জগতের কাজেই সীমাবদ্ধ নন, সমাজের নানা প্রচলিত ধারণা, বৈষম্য এবং নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বরাবরই সরব। তাঁর কথায়, সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, সময় ও সমাজের ছবিও তুলে ধরতে পারে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নারী-পুরুষের বৈষম্য, গর্ভাবস্থাকে ঘিরে সামাজিক মানসিকতা, স্টেরিওটাইপ এবং তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের আচরণ নিয়ে নিজের মতামত জানান তিনি। বিশেষ করে মেয়েদের শরীর, পোশাক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাজের অযাচিত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে দেখা যায় তাঁকে।
তথাগত বলেন, সমাজে এখনও মেয়েদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আলাদা করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। গর্ভাবস্থার মতো স্বাভাবিক একটি বিষয়কেও অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয়, যেন একজন নারী প্রেগন্যান্ট হলেই তাঁর সক্ষমতা এবং স্বাধীনতার একটা নির্দিষ্ট সীমা তৈরি হয়ে যায়। তাঁর প্রশ্ন, প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর শরীর ও পরিস্থিতি তো একরকম নয়, তাহলে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কেন প্রযোজ্য হবে? তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আট মাসের গর্ভাবস্থা নিয়েও কোনও মহিলা অলিম্পিকে দৌড়েছেন, আবার নয় মাসের গর্ভাবস্থায় কেউ আর্চারি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার মধ্যেও কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করার নজির রয়েছে।
তাই প্রেগন্যান্সিকে কোনওভাবেই নারীর ক্ষমতার সীমা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, একজন নারী মা হতে চলেছেন মানেই তিনি দুর্বল নন বা তাঁকে সবকিছু থেকে সরিয়ে রাখতে হবে না। এই ভাবনারই প্রতিফলন তাঁর সিনেমার চরিত্র ও গল্পের মধ্যেও রয়েছে বলে জানান তথাগত। তাঁর মতে, সমাজে ছোট ছোট বৈষম্যই ধীরে ধীরে বড় স্টেরিওটাইপ তৈরি করে। যেমন, ‘মেয়ে’ হলে তাকেই রান্না করতে হবে, আর ‘ছেলে’ হলে সে দেরি পর্যন্ত ঘুমানোর অধিকার পাবে এই ধরনের ধারণাগুলি কখনও আদর, কখনও স্নেহের নামে স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়। এমনকি মেয়েরাই কখনও কখনও মেয়েদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক মানসিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যান। মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে আটকে দেওয়ার বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেন।
তাঁর বক্তব্য, কাউকে একবার কোনও একটি পরিচয় বা স্টেরিওটাইপ দিয়ে চিহ্নিত করে দিলে তার বেড়ে ওঠার এবং নিজেকে বদলে নেওয়ার জায়গাটা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। ‘নিবানিব্বি’ শব্দটিকেও তিনি নেতিবাচক অর্থে আটকে রাখতে চাননি; বরং বর্তমান প্রজন্মের প্রেম, সম্পর্ক, ঝগড়া, মান-অভিমান এবং নিজেদের মতো করে বাঁচার ছবিকে তুলে ধরতেই এমন চরিত্রের প্রয়োজন বলে মনে করেন। গর্ভাবস্থাকে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করার কারণ ব্যাখ্যা করে তথাগত বলেন, প্রেগন্যান্সি কোনও ট্যাবু নয় এবং একজন নারী মা হতে চলেছেন মানেই তাঁর ক্ষমতা কমে যায় না। বরং মাতৃত্বও একজন নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হতে পারে। তাঁর কথায়, সিনেমায় এমন দৃশ্যও দেখা যায় যেখানে গর্ভাবস্থার কারণে কোনও নারী দৌড়তে পারছেন না সেটি দর্শকের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি করে।
কিন্তু মূল বিষয় হল, গর্ভাবস্থার নামে কোনও নারীকে আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলে দেওয়া উচিত নয়। তাঁর সিনেমা সরাসরি কাউকে আঙুল তুলে কিছু শেখায় না, বরং সমাজের একটি বাস্তব চিত্র সামনে তুলে ধরে। আর সেই বাস্তবতা হল আমরা এখনও এমন এক সে*ক্সিয়েস্ট সমাজে বাস করি, যেখানে একটি মেয়ের ব্লাউজ কেমন হবে, শাড়ির আঁচল কোথায় থাকবে সেটা নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষ করা হয়। তথাগতের স্পষ্ট বক্তব্য, একজন নারী কী পরবেন বা কীভাবে নিজের পোশাক পরবেন, সেই সিদ্ধান্ত একমাত্র তাঁরই হওয়া উচিত, বাইরের কারও নয়। সবশেষে তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ সমাজের ধারণা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তথাগত মুখার্জি। তাঁর মতে, শিক্ষা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের নাম নয়।
আরও পড়ুনঃ আবেগের দৃশ্যে কাঁদানো হয়তো সব শিল্পীর পক্ষেই সহজ, কিন্তু দর্শকদের মুখে নিয়মিত হাসি ফোটানো ততটাই কঠিন! শুভাশিস, কাঞ্চন থেকে বিশ্বনাথ ও খরাজ সেই অসাধ্য সাধনই করে চলেছেন! বাংলা বিনোদন জগতের এই তারকারা প্রমাণ করছেন কৌতুকের অভিনয়ও এক বড় শিল্প! জানেন, জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে আনন্দ দেওয়াও পিছনে কতটা পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে?
কেউ চারটি বইয়ের নাম বলতে পারেন, নিজের ঐতিহ্য, অতীত বা কাজ নিয়ে কথা বলতে পারেন তাতেই তাঁকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত বলা যায় না। সেই শিক্ষা জীবনে কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটাই আসল। অর্থাৎ মানুষের আচরণ, চিন্তাভাবনা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর মধ্যেই শিক্ষার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর বক্তব্যে তাই বারবার উঠে এসেছে একই প্রশ্ন সমাজের তৈরি করে দেওয়া স্টেরিওটাইপের বাইরে গিয়ে আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ দিতে পারছি? নারীকে আলাদা করে না দেখে, তাঁর শরীর, পোশাক, মাতৃত্ব বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করার জায়গাটিই তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।






