বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের টানাপোড়েনের জের এবার পৌঁছেছে লোকসভাতেও। তৃণমূল ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় যোগ দেওয়া ২০ জন সাংসদকে ঘিরে চলছে অযোগ্যতা সংক্রান্ত বিতর্ক। তাঁদের বিরুদ্ধে লোকসভায় অযোগ্য ঘোষণার আবেদন করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই লোকসভা সচিবালয় থেকে বিদ্রোহী সাংসদদের জবাব চাওয়া হয়েছিল। প্রথমে তাঁদের জবাব দেওয়ার জন্য মাত্র সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে জবাব প্রস্তুত করতে না পারায় আরও তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছিলেন তাঁরা। এবার সেই আবেদনেই সাড়া দিলেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা।
ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ার লোকসভা নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁরা ১ সেপ্টেম্বর লোকসভা সচিবালয়ের কাছে তিন সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁদের সেই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে বলে সচিবালয়ের চিঠিতে জানানো হয়েছে। ফলে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জবাব দেওয়ার সময় পেলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সময়ের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা আবেদনের বিরুদ্ধে নিজেদের বক্তব্য জমা দিতে হবে তাঁকে। ১৮ জুন অভিষেক ওই আবেদন করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সংবিধানের দশম তফসিলের অধীনে দলবদল সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, বিস্তারিত এবং শক্তিশালী জবাব তৈরি করার জন্যই তাঁদের অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
এই ঘটনাটির সূত্রপাত চলতি বছরের জুন মাসে। তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন দল ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার। লোকসভায় আলাদা আসনের দাবিতে তাঁরা ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরে ওই দলটির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার পাশাপাশি বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটকে সমর্থনের কথাও জানান তাঁরা। তাঁদের দাবি ছিল, ২০ জন সাংসদ তৃণমূলের লোকসভা সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হওয়ায় দলবদল বিরোধী আইনের নির্দিষ্ট বিধান তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্ব এই অবস্থান মানতে নারাজ। দলের তরফে স্পিকারকে জানানো হয়, তৃণমূল একটি একক এবং অবিভাজ্য রাজনৈতিক দল এবং বিদ্রোহী সাংসদদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়।
এই বিরোধের মধ্যেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দ্রুত অযোগ্যতার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আবেদন জানিয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন। ২৫ অগস্ট প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ বিষয়টি শুনতে রাজি হয় এবং ২০ সাংসদকে নোটিস দেওয়া হয়। স্পিকারের দফতরকে অযথা দেরি না করে বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এরপর ২৬ অগস্ট লোকসভা সচিবালয় থেকে বিদ্রোহী সাংসদদের জবাব চেয়ে নোটিস পাঠানো হয়। কিন্তু সাত দিনের সময়সীমার মধ্যে জবাব দেওয়ার বদলে অতিরিক্ত তিন সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়। বিদ্রোহী শিবিরের তরফে জানানো হয়েছে, তাঁরা আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেদের বক্তব্য তৈরি করছেন। অন্যদিকে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এই সময় চাওয়ার সমালোচনা করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিনেও যখন প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ছিল, তখন আরও সময়ের প্রয়োজন কেন।
আরও পড়ুনঃ ‘অত্যন্ত কু’রুচিকর! কেন করবেন এই ধরনের কাজ?’ ক্ষু’ব্ধ কলকাতা হাইকোর্ট, প্রধানমন্ত্রীর পোস্টার বিতর্কে শ্রীলেখাকে নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ! কার্টুন ‘জঘ*ন্য’ হলেও ৩৫৩(২) ধারায় নয়, তবে আদালতের রায়ে কী শাস্তি হল অভিনেত্রীর?
এই মুহূর্তে ওম বিড়লার সিদ্ধান্তে অন্তত ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বস্তির সময় পেলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এতে মূল বিতর্কের কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০ সাংসদের তৃণমূল ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় যোগদান এবং সেই যোগদান দলবদল বিরোধী আইনের আওতায় পড়ে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। লোকসভায় বিদ্রোহী সাংসদদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হলেও তাঁদের দলবদলকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁদের সংসদ সদস্যপদ এবং রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে টানাপোড়েন জারি রয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জবাব জমা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোবে। তৃণমূলের অযোগ্যতার আবেদন এবং বিদ্রোহী সাংসদদের পাল্টা যুক্তির মধ্যে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।






