বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন অনেক মুখ রয়েছে, যাদের একসময় দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল, কিন্তু সময়ের স্রোতে তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছেন স্মৃতির আড়ালে। ঠিক তেমনই এক নাম নন্দিনী মালিয়া। একসময় যার নিষ্পাপ হাসি আর মায়াবী চোখ বাংলা ছবির পর্দায় আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল, আজ সেই নামটাই যেন অনেকের কাছে অচেনা। অথচ তাঁর জীবনের গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, সংগ্রাম, সাফল্য আর অবহেলার এক মিশ্র কাহিনি।
১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্ম নন্দিনী মালিয়ার। খুব অল্প বয়সেই তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু। পরিচালক অরুন্ধতি দেবীর হাত ধরেই তিনি প্রথম বড় সুযোগ পান ‘ছুটি’ ছবিতে। সেই ছবিতে এক অসুস্থ কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মন জয় করেন। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পায়। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া গান আর নন্দিনীর অভিনয় এই জুটিই ছবিটিকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।
‘ছুটি’র পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি নন্দিনীকে। একের পর এক ছবিতে সুযোগ পেতে থাকেন। তবে সেই সাফল্যের সঙ্গেই শুরু হয় এক বড় সমস্যা, টাইপকাস্টিং। অসুস্থ বা দুঃখী চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে পরিচালকরা তাঁকে বারবার একই ধরনের চরিত্রেই কাস্ট করতে শুরু করেন। ফলে তাঁর অভিনয়ের বিস্তার সীমিত হয়ে পড়ে। যদিও ‘নিমন্ত্রণ’, ‘মাল্যদান’, ‘সংসার’, ‘সমর্পিতা’-র মতো ছবিতে তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন, তবুও সেই একঘেয়ে ইমেজ ভাঙা সহজ হয়নি।
৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাজ কমতে শুরু করে। অনেক পুরনো পরিচালক আর কাজ করছিলেন না, নতুনরাও তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। এই সময় তিনি থিয়েটার এবং আকাশবাণীর নাটকে কাজ করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন একা, একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে মেয়েকে বড় করেন। অর্থকষ্ট ও মানসিক চাপের মধ্যেই কাটছিল দিন। তবে পরিচালক স্বপন সাহার হাত ধরে আবার নতুনভাবে ফিরে আসেন তিনি। মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে তাঁর উপস্থিতি আবার নজর কাড়ে।
আরও পড়ুনঃ ‘গুন গুন করে মহুয়া’য় সন্ধ্যা রায়ের ছায়া, গুরুর স্পর্শে গড়ে ওঠা এক তারকার গল্পে গুরু ‘সন্ধ্যা’ হচ্ছেন কে?
ঠিক যখন আবার নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছেন, তখনই সবকিছু থেমে যায়। ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। শেষ পর্যন্ত কাজ করতেই করতেই চলে যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর টলিউডে খুব বড়সড় প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, এটাই হয়তো অভিনেত্রীর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। আজকের প্রজন্ম অনেকেই তাঁর নাম জানেন না, কিন্তু পুরনো দর্শকদের কাছে নন্দিনী মালিয়া এখনও এক আবেগ, এক স্মৃতি। তিনি যেন প্রমাণ করে গেছেন, প্রতিভা থাকলেই সবসময় প্রাপ্য সম্মান মেলে না, কিন্তু সত্যিকারের শিল্প কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।






