বাংলা বিনোদন জগতের আলো ঝলমলে পর্দার সামনে যে রঙিন পৃথিবী আমরা দেখি, তার আড়ালে ঠিক কতটা রাজনীতি আর ক্ষমতার টানাপোড়েন লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময়ই দর্শকের অজানা। বাইরে থেকে সাফল্য, পুরস্কার, জনপ্রিয়তার গল্প শোনা গেলেও, ভেতরে ভেতরে চলে সংগঠন, প্রভাব এবং সিদ্ধান্তের অদৃশ্য লড়াই। এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাওয়া বা হারানোর পিছনে শুধুই প্রতিভা নয়—অনেক সময় মতাদর্শও বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতার মাঝেই বরাবরই স্পষ্টভাষী মুখ হিসেবে পরিচিত চন্দন সেন। তিনি শুধু অভিনেতা নন, নাট্যকার ও মঞ্চনির্দেশক হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করছেন। গুরু হিসেবে পেয়েছেন উৎপল দত্ত ও রমাপ্রসাদ বণিক-এর সান্নিধ্য। ফলে শিল্পচর্চার সঙ্গে সমাজচেতনা ও রাজনৈতিক অবস্থান—এই তিনের ভারসাম্য তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে। নিজের কাজের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির অস্বস্তিকর দিক নিয়েও তিনি খোলাখুলি কথা বলতে পিছপা হন না।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে চন্দন সেন ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের একটি কঠিন সময়ের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সময়ে ইন্ডাস্ট্রিতে এক ধরনের “আনঅফিসিয়াল ব্যান” চালু ছিল। কোনও লিখিত নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, কাজের ক্ষেত্র কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হতো। তিনি জানান, এমনও পরিস্থিতি হয়েছে যখন প্রযোজকদের সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়—তাঁকে নিলে শুটিং হবে না। এমনকি দু’টি বাইকে করে এসে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও তিনি স্মরণ করেন, যেখানে অভিনেতা শুটিং করার কথা ছিল কিন্তু তাদের কথায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাজের সুযোগ, অডিশন, চুক্তি—সবকিছুতেই অদৃশ্য চাপ তৈরি করা হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ।
এই প্রসঙ্গেই তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা টানেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য-এর নাম করে। চন্দন সেনের কথায়, গত কয়েক মাস ধরে অনির্বাণের হাতে বড় কাজ না থাকায় ইন্ডাস্ট্রিতে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে ফেডারেশন ও পরিচালকদের মধ্যে যে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তার পর থেকেই অনেকেই বলছেন অনির্বাণকে নাকি কাজ দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, অনির্বাণ কোনও নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে দাঁড়াননি, নিজের মতামতেই অনড় ছিলেন—আর সেই কারণেই নাকি তাঁকে অলিখিতভাবে দূরে রাখা হচ্ছে। চন্দন সেনের মতে, একসময় অনেকেই মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সবাই সরে গিয়ে সমস্ত চাপটা যেন অনির্বাণের উপরেই পড়ছে। তিনি আরও বলেন, যে মানুষ নিজের অবস্থানকে ভুল মনে করেন না, তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলা আসলে অপ্রয়োজনীয়।
আরও পড়ুনঃ টলিউডে ফের অনির্বাণের প্রত্যাবর্তন! ফেডারেশন সঙ্গে দ্বন্দ্বের ইতি, কাটছে কি তবে জট? স্বরূপ বিশ্বাসের মন্তব্যে জোর জল্পনা, মার্চ মাসেই হতে পারে সম্ভাব্য ‘হোমকামিং’?
চন্দন সেনের বক্তব্যে একটা বড় সতর্কবার্তাও রয়েছে। তাঁর মতে, শিল্পের মান যদি শক্ত হয়, তবে কোনও রাজনৈতিক চাপ বা সংগঠনগত হস্তক্ষেপ চিরকাল তাকে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যদি সংকুচিত হয়, তবে তার ক্ষতি হবে গোটা বাংলা থিয়েটার ও সিনেমার ভবিষ্যতের। ২০১১-২০১৩ সালের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি যেন ইঙ্গিত দিচ্ছেন—ইতিহাস যদি থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে সেই ছায়া আবারও ফিরে আসতে পারে, এবং তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে শিল্পকেই।






