“শুটিং ফেলে আমার জন্য…বাড়িতে কোনও দিন তারকাসুলভ আচরণ দেখিনি, আমাদের কাছে তিনি ছিলেন শুধুই বাবা!” “ফেলুদা নিয়ে পরীক্ষা হলেও অপুকে ছোঁয়া যাবেই না, বাবার ওই চরিত্র আজও অতুলনীয়!” সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মানুষ ও অভিনেতা দুই সত্ত্বাকেই নতুনভাবে তুলে ধরলেন কন্যা পৌলমী বসু চট্টোপাধ্যায়! আবেগঘন স্মৃতিচারণে উঠে এল কোন তথ্য?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এমন এক নাম, যাঁর অভিনয় আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণা দেয় নতুন প্রজন্মকে। কিংবদন্তি এই অভিনেতার কন্যা পৌলমী বসু চট্টোপাধ্যায়ও দীর্ঘদিন ধরেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বাবার স্মৃতি ও তাঁর কাজ নিয়ে প্রায়ই কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বাবাকে ঘিরে একের পর এক ব্যক্তিগত স্মৃতি, পারিবারিক মুহূর্ত এবং তাঁর অভিনয় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন পৌলমী। সেখানে তিনি শুধু একজন মহান অভিনেতার কথাই বলেননি, বরং একজন স্নেহশীল বাবা, আদর্শ মানুষ এবং অসাধারণ অভিভাবক হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্য এক পরিচয়ও সকলের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই স্মৃতিচারণ ইতিমধ্যেই বহু অনুরাগীর মন ছুঁয়ে গিয়েছে।

পৌলমীর কথায়, বাইরে যত বড় তারকাই হোন না কেন, বাড়ির ভেতরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একেবারে সাধারণ মানুষ। অভিনয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের জন্য সময় বের করে নেওয়াই ছিল তাঁর অভ্যাস। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার জন্য বাবাকেই চাইতেন পৌলমী। সেই আবদার পূরণ করতে শুটিংয়ের ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও তিনি সুযোগ পেলেই মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন বা নিয়ে আসতেন। বাবা হিসেবে কোনও দায়িত্ব থেকে তিনি কখনও নিজেকে সরিয়ে রাখেননি। সন্তানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে তিনি সব সময় তাঁদের চিন্তা, মত এবং সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে ভালো মানুষ হওয়াটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শুধু সংসারের দায়িত্ব নয়, সন্তানদের সাংস্কৃতিক বিকাশ নিয়েও সমানভাবে সচেতন ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পৌলমীর মতে, তাঁদের বাড়িতে কোনও দিন একঘেয়ে পরিবেশ ছিল না। বই পড়া, ভালো গান শোনা, নাটক দেখা কিংবা শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা ছিল নিত্যদিনের বিষয়। ছোটবেলা থেকেই এই পরিবেশে বড় হওয়ায় শিল্প ও সাহিত্য তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছিল। তিনি মনে করেন, এই শিক্ষাই তাঁদের মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। একজন বাবা হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কখনও শুধু উপদেশ দেননি, বরং নিজের জীবনযাপন দিয়েই সন্তানদের সামনে উদাহরণ তৈরি করেছিলেন। সেই কারণেই আজও তাঁর শেখানো মূল্যবোধ তাঁদের জীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে রয়েছে।

সাক্ষাৎকারে বাবার অভিনয় নিয়েও বিস্তারে কথা বলেন পৌলমী। তাঁর মতে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রতিটি চরিত্রে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলার ক্ষমতা। তিনি কোনও চরিত্রে নিজের ব্যক্তিত্বকে চাপিয়ে দিতেন না, বরং সেই চরিত্রের মধ্যেই নিজেকে বিলিয়ে দিতেন। ‘অপুর সংসার’-এর অপু, ‘অশনি সংকেত’-এর গঙ্গাচরণ, ‘ঝিন্দের বন্দী’-র শঙ্কর কিংবা ‘কনি’-র কোচ, প্রতিটি চরিত্রই ছিল একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি ‘ময়ূরাক্ষী’ ছবিতে অ্যালজাইমার আক্রান্ত মানুষের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণাও করেছিলেন। চরিত্রকে নিখুঁত করে তুলতে তাঁর এই নিষ্ঠাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল বলে মনে করেন পৌলমী।

আরও পড়ুন: “বাপিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি…মধুবালার মতো সুন্দরী মহিলার প্রেমে পড়লে দোষের কী! কিন্তু মা আর বাপির সম্পর্কটা ভে’ঙেছিল…” কিশোর কুমারের জীবনের অজানা অধ্যায় প্রকাশ্যে আনলেন প্রথম স্ত্রীর কন্যা তথা সঙ্গীতশিল্পী শ্রমণা গুহঠাকুরতার! জানালেন, মধুবালার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে নয়, রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে গায়কের বি’চ্ছেদের নেপথ্যে কী ছিল আসল কারণ?

ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার কথা স্বীকার করলেও পৌলমীর মতে, তাঁর অভিনীত অপু চরিত্রের কোনও বিকল্প হতে পারে না। তাঁর বিশ্বাস, ‘অপুর সংসার’-এর অপুর সংবেদনশীলতা, আবেগ এবং অপর্ণার সঙ্গে সম্পর্কের যে গভীরতা পর্দায় ফুটে উঠেছিল, তা আজও অনন্য। তাই এই চরিত্রকে নতুন করে কল্পনা করা বা অন্য কাউকে সেই জায়গায় বসানো তাঁর কাছে খুব কঠিন। তবে ফেলুদা চরিত্র নিয়ে তিনি অনেকটাই উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন অভিনেতারা এই চরিত্রে অভিনয় করবেন, সেটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন তিনি। টোটা রায়চৌধুরীর অভিনয়ও তিনি উপভোগ করেছেন বলেই জানান।

পুরো আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মানবিক দিক। পৌলমীর মতে, তাঁর বাবা শুধু একজন অসাধারণ অভিনেতাই ছিলেন না, ছিলেন দায়িত্বশীল পরিবারপ্রেমী মানুষও। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও তিনি কখনও পরিবারকে অবহেলা করেননি। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং সঠিক মূল্যবোধ শেখানো ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন শিল্পীর পাশাপাশি একজন মানুষ হিসেবেও তিনি যে কতটা বড় ছিলেন, সেই ছবিই এই স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়েছে। তাই আজও অনুরাগীদের কাছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুধু বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নন, একজন আদর্শ বাবা এবং অসাধারণ মানুষ হিসেবেও সমান শ্রদ্ধার আসনে রয়েছেন।

You cannot copy content of this page