“আমি হয়তো একমাত্র যে…” দীর্ঘদিন সঙ্গীতজগতের সঙ্গে যুক্ত, এত উল্লেখযোগ্য গান থেকেও বঙ্গভূষণ-বঙ্গবিভূষণ কোনোটাই নয়, কেন সরকারি স্বীকৃতির তালিকায় জায়গা পেলেন না জয়তী চক্রবর্তী? “এখনও ভালো কাজের তেমন কোনও নজির পাইনি” নতুন সরকার নিয়ে আশাবাদী হয়েও কেন এমন মন্তব্য শিল্পীর? বদলের পরও হতাশ তিনি?

বিনোদন জগতে শিল্পীদের প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন সম্মান ও পুরস্কার দেওয়া হলেও, সেই সম্মানের আড়ালে তাঁদের লড়াই, অবহেলা এবং অসম্মানের গল্প অনেক সময়ই সামনে আসে না। বিশেষ করে সঙ্গীতশিল্পীদের ক্ষেত্রে মঞ্চের আলো যতটা উজ্জ্বল, তার বাইরে তাঁদের পথ ততটাই কঠিন। জনপ্রিয়তা, পরিচিতি কিংবা মানুষের ভালোবাসা থাকলেও প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার আক্ষেপ অনেক শিল্পীর মনেই থেকে যায়। সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাই এবার উঠে এল সঙ্গীতশিল্পী জয়তী চক্রবর্তীর কথায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি শুধু নিজের শিল্পীজীবনের কথা বলেননি, বরং বাংলার সঙ্গীত সমাজের নানা দিক নিয়েও অকপটে মুখ খুলেছেন।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন জয়তী চক্রবর্তী। দীর্ঘদিন ধরে গানকে সঙ্গী করে পথ চলেছেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে যেমন শ্রোতারা পেয়েছেন আবেগ ও সংবেদনশীলতার ছোঁয়া, তেমনই শিল্পী হিসেবেও নানা বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য বারবার নজর কেড়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ‘বঙ্গভূষণ’ নাকি ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান পেয়েছেন? উত্তরে হেসেই জয়তী জানান, তিনি কোনোটিই পাননি। তাঁর কথায়, তিনি শুধু ‘সঙ্গীত সম্মান’ পেয়েছেন। এমনকী তাঁকে বলা হয়, বাংলায় সঙ্গীতশিল্পীরা সাধারণত কোনও না কোনও ‘ভূষণ’ সম্মান পেয়েছেন। তখনও হাসতে হাসতে জয়তী জানান, সম্ভবত তিনিই ব্যতিক্রম।

 Jayati Chakraborty

তবে বিষয়টি নিয়ে তাঁর মনে কোনও ক্ষোভ আছে কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে জয়তী বলেন, কেন এমন হয়েছে তা তিনি নিজেও জানেন না। তবে পুরস্কার বা সরকারি স্বীকৃতির বাইরেও বাংলার মানুষের ভালোবাসা যে তিনি পেয়েছেন, সেটিই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। তাঁর কথায়, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি এমনিতেই জায়গা করে নিয়েছেন। এই প্রসঙ্গ থেকেই তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে শিল্পীদের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতির প্রশ্ন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, শিল্পীর সাফল্যের পিছনে যেমন মানুষের ভালোবাসা থাকে, তেমনই থাকে অবহেলা, অসম্মান এবং একাকীত্বের মতো কঠিন অভিজ্ঞতাও। দিনের শেষে শিল্পীর ব্যক্তিগত লড়াই অনেকটাই একার।

সাক্ষাৎকারে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়েও মতামত দেন জয়তী। গত ১৫ বছর তৃণমূল সরকারে থাকার সময় সবকিছু যে খারাপ হয়েছে, এমনটা তিনি মনে করেন না বলেই জানান। তাঁর মতে, সেই সময় বেশ কিছু ভালো কাজও হয়েছে। তবে সরকারের শেষের দিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আর সেই কারণেই হয়তো পরিবর্তনের প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে তাই একদিকে যেমন অতীত সরকারের কাজের ইতিবাচক দিক স্বীকার করার জায়গা রয়েছে, তেমনই রয়েছে সাধারণ মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথাও।

আরও পড়ুনঃ “আমি ফেম-নেমের প্রতি কখনও আকৃষ্ট ছিলাম না, এটাই আমার ব্লেসিং!” শকুন্তলা বড়ুয়ার মেয়ে হয়েও কেন খ্যাতির ঝলমলে দুনিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেন পিলু বিদ্যার্থী? কীভাবে মায়ের পরিচয়ের ছায়া থেকে সরে নিজেকে গড়েছেন রাজশী? স্বেচ্ছায় স্বামী ও সংসার ছেড়ে বেরিয়ে এসেও কেন ‘বিদ্যার্থী’ পদবী ত্যাগ করেননি তিনি?

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাই অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন জয়তী। আগামী দিনে নতুন কিছু হবে, পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে এবং ভালো কাজ হবে এই আশা এখনও তাঁর রয়েছে। তবে একইসঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, নতুন সরকার আসার পর কয়েক মাস কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত এমন কোনও উল্লেখযোগ্য ভালো কাজের নজির তিনি দেখতে পাননি, যা তাঁকে আশ্বস্ত করতে পারে। ফলে তাঁর কথায় আশাবাদ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অপেক্ষা এবং বাস্তব পরিস্থিতি দেখার সতর্ক দৃষ্টিও। সব মিলিয়ে জয়তী চক্রবর্তীর এই সাক্ষাৎকার শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা নয়, বরং শিল্পী-সমাজ, সরকারি স্বীকৃতি এবং বাংলার পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর নিজস্ব, অকপট দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছে।

You cannot copy content of this page