বাংলা বিনোদন জগৎ এখন যেন ধীরে ধীরে রাজনীতিরই আরেকটি অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দা এমন খুব কম তারকাই রয়েছেন, যাঁদের নাম কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়ায়নি। কেউ সরাসরি প্রার্থী হয়েছেন, কেউ দলীয় মঞ্চে উপস্থিত থেকেছেন, আবার কেউ সামাজিক কর্মসূচির মুখ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে গত এক দশকে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনোদন জগতের এক বড় অংশকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। তবে এই আবহের মধ্যেই একেবারে ব্যতিক্রমী অবস্থান নিয়ে সামনে এলেন অভিনেত্রী লাবনী সরকার। স্পষ্ট ভাষায় তিনি জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনওদিন কোনও রাজনৈতিক পতাকা ধরেননি এবং কোনও দলের ছত্রছায়াতেও নিজেকে রাখেননি।
এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী বলেন, “আমি তো কোনওদিনও কোনও রাজনৈতিক পতাকা ধরিনি, আমি তো কোনওদিনও কারও সাহায্য নিইনি, আমি তো কোনওদিনও রাজনৈতিক সভামঞ্চের কোনও অনুষ্ঠানে যাইনি, তাহলে আমি কেন বা আমার মতো ব্যক্তিরা কেন দায় নেবেন?” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। অভিনেত্রী আসলে বলতে চেয়েছেন যে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের স্বার্থে বিনোদন জগতের পরিচিত মুখদের ব্যবহার করে থাকে। ভোটের সময় সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় তারকাদের মুখ সামনে এনে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। আর বর্তমানে বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে সেই বিষয়টিই আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসছে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বাংলার শাসকদলের সঙ্গে টলিউডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। পরিচালক থেকে অভিনেতা একাধিক তারকা সরাসরি রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন। কেউ সাংসদ হয়েছেন, কেউ বিধায়ক, আবার কেউ গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদেও ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের বহু পরিচিত মুখকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রচারে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। বিজেপির বিপুল জয়ের পর ধীরে ধীরে সামনে আসছে নানা অভ্যন্তরীণ তথ্য ও অসন্তোষের কথাও। সেই আবহেই লাবনী সরকারের মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
আরও পড়ুন: “দিদি যদি ডাকে ‘না’ বলা যায় না কেন, নিজস্ব মূল্যবোধ বা আদর্শ নেই?” “শুধু টিভিতে মুখ দেখা যায় বলে…” রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা বিদীপ্তা চক্রবর্তীর! নাম না করেই, কোন লজ্জার কথা বললেন অভিনেত্রী?
অভিনেত্রী আরও বলেন, “আমাদের মতো শিল্পীদের কী হবে?” তাঁর এই কথার মধ্যে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে সেইসব শিল্পীদের উদ্বেগ, যাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না থাকলে শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একইসঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “যারা গাছেরও খাচ্ছেন আবার তলারও কুড়োচ্ছেন, তারা দীর্ঘদিন মানুষের সেবা করার নাম করে নিজেদের পকেট ভরিয়ে গিয়েছেন।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে অভিনেত্রী ইঙ্গিত করেছেন, কিছু মানুষ জনসেবার নাম করে ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগ করেছেন এবং নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছেন।
শুধু তাই নয়, অভিনেত্রী আরও দাবি করেন, যারা মানুষের উপকার করার কথা বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, বাস্তবে সাধারণ মানুষ তাঁদের কাজের প্রকৃত সুফল কতটা পেয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। যদিও তিনি কারও নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবুও রাজনৈতিক মহল থেকে টলিউড সর্বত্রই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তাঁর এই বক্তব্য মূলত সেইসব তারকাদের উদ্দেশ্যেই, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই তালিকায় উঠে আসছে রাজ চক্রবর্তী, সায়নী ঘোষ, দেব এবং সোহম চক্রবর্তী, ব্রাত্য বসুর মতো একাধিক পরিচিত মুখের নাম। লাবনী সরকারের এই বিস্ফোরক মন্তব্য এখন বাংলা বিনোদন এবং রাজনৈতিক দুই মহলেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।






