‘ওটা যেমন মিথ্যে এটাও তেমন মিথ্যে…’ উত্তম কুমারের মৃ’ত্যুতে হঠাৎ কেন এমন প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়? বহু বছর পর মহানায়কের মৃ’ত্যুর দিনের ঘটনা স্মৃতিচারণ করে কি জানালেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী?

বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের কথা উঠলেই যে কয়েকটি নাম প্রথম সারিতে উঠে আসে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মহানায়ক উত্তম কুমার এবং কিংবদন্তি অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়। একদিকে উত্তম কুমার ছিলেন বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমার সর্বকালের জনপ্রিয়তম নায়ক, অন্যদিকে মাধবী মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল মুখ। তাঁদের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দার উপস্থিতি আজও দর্শকদের কাছে সমানভাবে আকর্ষণীয়। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তাঁরা দু’জনই নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে অমর হয়ে রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী এসেছেন, গিয়েছেন, কিন্তু উত্তম-মাধবীর কাজ এখনও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।

যদিও উত্তম কুমার ও মাধবী মুখোপাধ্যায়কে নিয়মিত জুটি হিসেবে দেখা যায়নি, তবুও একসঙ্গে অভিনীত তাঁদের ছবিগুলি দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ‘ছদ্মবেশী’, ‘বিরাজ বৌ’ এবং ‘অগ্নিশ্বর’-এর মতো ছবিতে তাঁদের অভিনয় আজও সমানভাবে প্রশংসিত। পর্দার বাইরে দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সম্পর্কও ছিল যথেষ্ট গভীর। মাধবী মুখোপাধ্যায় একাধিকবার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মহানায়কের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও আবেগের কথা তুলে ধরেছেন। সেই সম্পর্কের উষ্ণতা এবং স্মৃতিই আজও তাঁকে উত্তম কুমারের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মহানায়কের মৃত্যুর দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মাধবী মুখোপাধ্যায়। তিনি জানান, সেদিন তিনি ‘মা’ নামে একটি নাটকে অভিনয় করছিলেন। নাটক শেষ করে বাড়ি ফেরার পর তাঁর কাছে লালবাজার থেকে একটি ফোন আসে। তাঁকে জানানো হয়, তাঁর বাড়িতে কয়েকজন অসামাজিক ব্যক্তি ঢুকেছিল। সেই ঘটনার মধ্যেই আরেকটি ফোন আসে, যেখানে তাঁকে বলা হয় উত্তম কুমার মারা গিয়েছেন। কিন্তু সেই খবর তিনি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি।

মাধবী জানান, খবরটি শোনার পর তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, “ওটা যেমন মিথ্যে, এটাও তেমন মিথ্যে।” কারণ তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এমন একজন মানুষ, যিনি বাংলা সিনেমার প্রাণ, তিনি হঠাৎ করে চলে যেতে পারেন না। তিনি বিষয়টিকে গুজব বলেই ভেবেছিলেন। পরে যখন তিনি খেতে বসেছিলেন, তখন অভিনেতা অর্থেন্দু চৌধুরী তাঁকে ফোন করে একই খবর দেন। অর্থেন্দু চৌধুরীর মুখে উত্তম কুমারের মৃত্যুর কথা শোনার পর আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি মাধবী। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বুঝতে পারেন যে খবরটি সত্যি।

এরপর রাতেই তাঁরা উত্তম কুমারের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু তখন অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় মহানায়কের মরদেহ এখনও বাড়িতে পৌঁছায়নি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তাঁরা ফিরে আসেন। পরদিন সকালে যখন উত্তম কুমারের মরদেহ বাড়িতে আনা হয়, তখন আবার সেখানে যান মাধবী মুখোপাধ্যায়। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে তাঁর মন ভেঙে গিয়েছিল। মহানায়কের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার সময় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাস্তবের কঠিন সত্যকে।

আরও পড়ুনঃ “উত্তম পালিয়েছে সুচিত্রাকে নিয়ে!” মহানায়িকার এক আবদারেই অস্বস্তিতে পড়েছিলেন মহানায়ক, শুটিং ফ্লোরেই কেন সতর্ক করতে বাধ্য হয়েছিলেন মহানায়িকাকে? সামনে এলো দুই কিংবদন্তির সেই স্মরণীয় ঘটনা!

সাক্ষাৎকারে মাধবী মুখোপাধ্যায় বলেন, উত্তম কুমারের পায়ে হাত দেওয়ার পর তিনি অনুভব করেছিলেন শরীরের উষ্ণতা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। সেই মুহূর্তেই তিনি মনের গভীরে উপলব্ধি করেন যে মহানায়ক সত্যিই আর নেই। বহু দশক কেটে গেলেও সেই দিনের স্মৃতি এখনও তাঁর কাছে সমানভাবে স্পষ্ট ও বেদনাময়। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমারের প্রস্থান যেমন এক যুগের অবসান ঘটিয়েছিল, তেমনি তাঁর সহকর্মী ও অনুরাগীদের মনেও রেখে গিয়েছিল এক গভীর শূন্যতা। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের এই আবেগঘন স্মৃতিচারণ সেই হারিয়ে যাওয়া সময় এবং মহানায়কের প্রতি মানুষের অমলিন ভালোবাসাকেই আরও একবার সামনে এনে দিল।

You cannot copy content of this page