“বিদেশের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝকঝকে লাগে, বাস্তবে ততটা সহজ নয়” “সফল হওয়াটাই সব নয়, যে মানুষগুলো তোমার জন্য জীবন কাটিয়ে দিল তাদের দিকেও তাকাতে হবে” কলকাতা বৃদ্ধাশ্রমে রূপান্তরিত হচ্ছে! নিজের উন্নতিতে যেন বাবা-মায়ের একাকীত্ব লুকিয়ে না থাকে, নতুন প্রজন্মকে কী বার্তা মমতা শঙ্করের?

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মমতা শঙ্কর বরাবরই নিজের স্পষ্ট মতামতের জন্য পরিচিত। সমাজের নানা বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে গিয়ে একাধিকবার বিতর্কের কেন্দ্রেও উঠে এসেছেন তিনি। কখনও বর্তমান প্রজন্মের জীবনযাপন, কখনও সামাজিক মূল্যবোধ কিংবা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর মন্তব্য সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম কেড়ে নিয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কলকাতা শহর এবং বর্তমান প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বক্তব্য আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। অভিনেত্রীর মতে, আজকের কলকাতা ধীরে ধীরে যেন “বৃদ্ধাশ্রমে” পরিণত হচ্ছে, কারণ অধিকাংশ তরুণ-তরুণী কাজ বা পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর ও অমলা শঙ্করের কন্যা মমতা শঙ্কর ছোট থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছেন। তিনি একাধারে অভিনেত্রী, কোরিওগ্রাফার এবং দক্ষ নৃত্যশিল্পী হিসেবে বাংলা সংস্কৃতির জগতে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন। ১৯৭৭ সালে মৃণাল সেন পরিচালিত “মৃগয়া” ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিনয় জীবনের সূচনা হয়। প্রথম ছবিতেই তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের নজর কেড়ে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমার অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।

আরও পড়ুন: “দুই মেয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই চুপ ছিলাম, প্রভাবশালী পরিবারে…” স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি, আইনি বিচ্ছেদের পথে স্ত্রী জুঁই! টলিউডের দুর্নীতি প্রসঙ্গে একাধিক তথ্য নিয়ে বি’স্ফোরক কাউন্সিলর!

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে মমতা শঙ্কর কাজ করেছেন একাধিক কিংবদন্তি পরিচালকের সঙ্গে। সত্যজিৎ রায়ের “শাখা প্রশাখা” ও “আগন্তুক”-এ তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে রয়েছে। পাশাপাশি ঋতুপর্ণ ঘোষের “দহন”, “উৎসব” এবং “আবহমান”-এর মতো ছবিতে তাঁর সংযত ও বাস্তবধর্মী অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এছাড়াও “দাখাল”, “জাতিশ্বর”, “প্রজাপতি” এবং “প্রধান”-এর মতো ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যচর্চাতেও তিনি সমানভাবে সক্রিয় এবং বহু বছর ধরে নিজের নৃত্যসংস্থা পরিচালনা করছেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মমতা শঙ্কর বলেন, বর্তমান সময়ে বহু ছেলে-মেয়ে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য বিদেশে কিংবা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই প্রবণতার ফলে কলকাতা শহরে বয়স্ক বাবা-মায়ের সংখ্যা বাড়ছে এবং শহর ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। অভিনেত্রী মনে করেন, একসময় বিদেশে গিয়ে জীবন গড়া অনেকের কাছে স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখন বিদেশের জীবনও আগের মতো সহজ নয়। সেখানেও কাজের অভাব, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ বেড়েছে। তাই শুধুমাত্র বিদেশের মোহে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে, বাইরে গিয়ে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে আবার নিজের দেশে ফিরে আসার কথা বলেছেন তিনি।

মমতা শঙ্করের বক্তব্যে মূলত পরিবার, সমাজ এবং নিজের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাই উঠে এসেছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বিদেশে পড়াশোনা বা কাজ করা খারাপ নয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের মাটি ও নিজের মানুষদের ভুলে গেলে চলবে না। বাইরে থেকে নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে যদি সেই অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, তাহলে তা সমাজের পক্ষেও ইতিবাচক হবে। একইসঙ্গে এতে বাবা-মায়ের কাছেও সন্তানরা থাকতে পারবে, যা মানসিক দিক থেকে অনেক বড় ভরসা। অভিনেত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

You cannot copy content of this page