বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মহুয়া রায়চৌধুরীর নাম আজও একইরকম উজ্জ্বল। মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এতটুকুও কমেনি। সেই আগ্রহকেই আরও একবার সামনে নিয়ে আসছে পরিচালক রাজদীপ ঘোষের নতুন ছবি ‘গুন গুন করে মহুয়া’। প্রযোজক রাণা সরকারের এই ছবিতে মহুয়ার আদলে তৈরি চরিত্রে অভিনয় করছেন অঙ্কিতা মল্লিক। ছোটপর্দায় পরিচিত মুখ অঙ্কিতার এটি প্রথম বড়পর্দার ছবি। ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে আসা পোস্টারে তাঁর লুক দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন।
মেকআপ শিল্পী সোমনাথ কুণ্ডুর দক্ষতায় অঙ্কিতাকে প্রায় অবিকল মহুয়ার মতো দেখাচ্ছে বলেই মত সিনেমাপ্রেমীদের একাংশের। ছবিকে ঘিরে কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত জানান, মহুয়া রায়চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ না পাওয়া তাঁর আজও বড় আফসোস। তাঁর কথায়, “আমার আফসোস, মহুয়া রায়চৌধুরীর সঙ্গে কাজের সুযোগ হয়নি। কিন্তু কাজ দেখে বুঝেছি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানিত হওয়ার মতো তাঁর অভিনয়।” তিনি আরও বলেন, একটি বইয়ে পরিচালক তরুণ মজুমদারের নির্দেশে মহুয়ার একটি আবেগঘন দৃশ্যের বর্ণনা পড়ে পরে সেই দৃশ্য দেখার সময় তাঁর শরীরে কাঁটা দিয়েছিল।
ঋতুপর্ণার মতে, শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনা অনেক হলেও তাঁদের সংগ্রাম এবং পরিশ্রমকে সেইভাবে সম্মান দেওয়া হয় না। তাই মহুয়ার জীবন নিয়ে ছবি তৈরি হওয়াকে তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ বলেই মনে করছেন। ঋতুপর্ণা আরও বলেন, “আমার মনে হয়, একটা স্মৃতিসৌধ যদি করা যায় ওঁর, কারণ সেই সময়ে নায়কদের সঙ্গে একেবারে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। আর যে নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন, সেটাই হিট। অন্যধারার ছবি থেকে বাণিজ্যিক ছবিতি, সবেতেই নজর কেড়েছেন।” তাঁর মতে, বাংলা সিনেমায় মহুয়ার অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে আরও বেশি করে তুলে ধরা প্রয়োজন। সেই কারণেই এই ধরনের উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে মহুয়াকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেও এমন কোনও কাজ করতে চান বলেও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। এদিকে প্রয়াত অভিনেতা তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী পালও মহুয়া রায়চৌধুরীকে নিয়ে বহু ব্যক্তিগত স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি জানান, মহুয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাপস পাল ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই অবস্থায় মহুয়াকে দেখতে পারেননি। নন্দিনীর কথায়, “প্রথম ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে তাপসের সঙ্গে শুটিং। তাপস বলেছিল, মহুয়াদিদির কান্নার দৃশ্যটা কাট হয়ে যাওয়ার পর দশ মিনিট ধরে কেঁদেছিল। এতটা একাত্ম হয়ে যেত। আবার গায়ে আগুন লাগার আগে, তাপসের সঙ্গে শেষ দৃশ্য করেছে।
ফোনে সংলাপ বলছে, ‘আমি ভালো নেই’। কীরকম কাকতালীয়!” তিনি আরও জানান, নিজের বিয়েতে উপস্থিত থাকতে না পারলেও মহুয়া তাঁকে ম্যাজেন্টা রঙের একটি বেনারসি উপহার দিয়েছিলেন, যা এখনও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। নন্দিনী আরও একটি ব্যক্তিগত ঘটনার কথা তুলে ধরে বলেন, একদিন তিনি মহুয়ার হাতে কাটা দাগ দেখে কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তখন অভিনেত্রী তাঁকে বলেছিলেন, “তুমি বড় হও। তোমাকে সব বুঝিয়ে বলব।” সেই উত্তর আজও তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। নন্দিনীর মতে, মহুয়াকে নিয়ে নানা ধরনের ধারণা প্রচলিত থাকলেও তিনি কখনও তাঁকে উচ্ছৃঙ্খল মানুষ বলে মনে করেননি।
আরও পড়ুনঃ “ওঁর সাহস ও অস’ভ্যতা বেড়ে গিয়েছিল দিনে দিনে, সব রেকর্ডিং আছে, কল্যাণদা মহিলাদের সঙ্গে…” “নিচু স্তরের লোকেদের ভাষায় গা’লাগা’লি, দিদিকে কমপ্লেন করতেই…” লোকসভা থেকে সাসপেন্ড হতেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একের পর এক বি*স্ফোরক তথ্য ফাঁস করলেন শতাব্দী রায়!
বরং তাঁর বিশ্বাস, মহুয়া ছিলেন অত্যন্ত অভিমানী এবং সংবেদনশীল একজন মানুষ। ব্যক্তিগত জীবন ও অভিনয়, দুটো ক্ষেত্রেই তিনি নিজের আবেগকে গভীরভাবে ধারণ করতেন। মহুয়া রায়চৌধুরীর জীবনকে ঘিরে রহস্য, সাফল্য, সংগ্রাম এবং অসংখ্য স্মৃতি আজও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। সেই কারণেই ‘গুন গুন করে মহুয়া’ ছবিকে ঘিরে দর্শকদের প্রত্যাশাও তুঙ্গে। অনেকেরই বিশ্বাস, এই ছবির মাধ্যমে মহুয়ার ব্যক্তিত্ব, অভিনয়ের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এবং জীবনের অজানা দিকগুলির কিছুটা হলেও নতুন করে তুলে ধরা সম্ভব হবে। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁর অনুরাগীরা, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও এই ছবির মাধ্যমে এক কিংবদন্তি অভিনেত্রীকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ পাবে।






