“নিজের বাবা আমাকে বিশ্বাস করতেন না, বাড়ির লোকেরাও আমায়…” ছোট পো’শাক পরলেই ‘অ’সভ্য’ তকমা! রাত করে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন, সমাজের তা’চ্ছিল্য ও অ’বিশ্বাস পেরিয়ে সাফল্যের পথে ‘কম্পাস’-এর পর্ণা চক্রবর্তী! জীবনের কোন ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করলেন তিনি?

স্টার জলসার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কম্পাস’-এর অভিনেত্রী পর্ণা চক্রবর্তী নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছেন অভিনেত্রী। পর্দায় তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয়, ছোট চুলের আলাদা লুক এবং সহজ-সরল উপস্থিতি যেমন দর্শকদের নজর কেড়েছে, তেমনই বাস্তব জীবনের সংগ্রামের গল্প শুনে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের কঠিন সময়, পরিবারের অবিশ্বাস, সমাজের তাচ্ছিল্য এবং স্বপ্নের জন্য লড়াইয়ের কথা খোলাখুলি জানালেন তিনি।

অভিনয় জগতে আসার আগে মডেলিং দিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু। কিন্তু সেই পথ মোটেও সহজ ছিল না। অভিনেত্রীর কথায়, “আমার বাড়ি থেকে বিশ্বাসই করা হতো না যে আমি কিছু করতে পারবো বা জীবনে দাঁড়াতে পারবো।” তিনি জানান, তখন দমদম জুড়ে তাঁর বড় বড় হোর্ডিং থাকলেও বাড়িতে সেই সাফল্যের কোনও মূল্য ছিল না। রাত করে শুটিং থেকে ফিরলে বাবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো তাঁকে। অভিনেত্রী বলেন, “সেইদিন রাত্রেই বাবা আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না যে এত দেরি করে কেন ফিরেছো। বৃষ্টি, ঝড় নিজের বাবা পর্যন্ত বিশ্বাস করেনি আমি কোথায় শুট করেছি।” নতুন মডেল হওয়ায় হাতে কোনও প্রমাণও থাকত না। ফটোগ্রাফাররা সময়মতো ছবি দিতেন না, ফলে পরিবারের সন্দেহ আরও বাড়ত।

শুধু পরিবারের অবিশ্বাস নয়, সমাজের কটূক্তিও তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। অভিনেত্রীর কথায়, “আমাদের পাড়ার এক কাকু বাবাকে বলেছিল, ‘তোর মেয়ে কি কি শুট করেছে দেখ।’ ছোট জামাকাপড় পড়লেই মেয়েরা অসভ্য হয়ে যায় এই মানসিকতা এখনও অনেকের মধ্যে আছে।” এই ধরনের মন্তব্য তাঁকে ভিতর থেকে আঘাত করলেও তিনি হার মানেননি। বরং আরও জেদ নিয়ে নিজের কাজ করে গিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেন, “সমস্ত কাজকেই রেসপেক্ট করা উচিত। মডেলরাও ভীষণ পরিশ্রম করে। একদিনে ২০০-৩০০টা শাড়ি চেঞ্জ করা মুখের কথা নয়। হিল পরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ফুলে যায়। কিন্তু সেই স্ট্রাগল কেউ দেখে না, আগে থেকেই জাজ করে দেয়।”

অভিনেত্রী আরও জানান, শুরুতে মডেলিং করে তেমন কোনও রোজগারও হতো না। বরং নিজের পকেট থেকেই খরচ করে পোর্টফোলিও তৈরি করতে হতো। তাঁর কথায়, “প্রথমে তো টাকা ইনকামই হতো না। কোলাবরেশনে কাজ করতে হতো। নিজের খরচে শুট করে যেতে হতো শুধু প্রোফাইল বানানোর জন্য।” সেই সময় বাবার প্রশ্ন ছিল, “কি কাজ করিস?” আর থিয়েটার করতে শুরু করার পর সেই অবস্থা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তবুও তিনি থেমে যাননি। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন না একদিন নিজের পরিচয় তিনি তৈরি করতেই পারবেন।

আজ পরিস্থিতি বদলেছে, যাঁরা একসময় তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁরাই এখন প্রশংসা করেন। অভিনেত্রী নিজেও অবাক হয়ে বলেন, “এখন সবাই খুব সাপোর্টিভ। সবাই মেনে নিয়েছে। কি করে হঠাৎ করে মেনে নিল, আমি কিন্তু জানি না।” তবে পুরনো কষ্টগুলো তিনি ভোলেননি। বরং সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও শক্ত করেছে। তাঁর মতে, মানুষের বাইরের শিক্ষা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেতরের মানসিকতা। তিনি বলেন, “দামি গাড়ি, দামি ফোন ব্যবহার করলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। মানসিকতা না বদলালে কোনও লাভ নেই।”

নিজের চরিত্র ‘কম্পাস’-এর সঙ্গেও বাস্তব জীবনের মিল খুঁজে পান অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, “কম্পাসের সঙ্গে আমার অনেক মিল। আমি যেমন স্পষ্ট কথা বলি, জেদি আর ফ্রিকেল মাইন্ডেড, কম্পাসও তেমন।” তাই প্রথম দিন থেকেই চরিত্রটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। দর্শকদের ভালোবাসাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। আর অতীতের অপমান, অবিশ্বাস ও তাচ্ছিল্য? সেগুলোকে তিনি জীবন থেকে মুছে ফেলেননি। বরং হেসে বলেন, “সব রেখে দিয়েছি। এখন শুধু হাই-হ্যালো করি। কারণ আমি জানি, কারও মানসিকতা আমি বদলাতে পারবো না।”

আরও পড়ুনঃ “আমার পেশা অভিনয়, যার সূত্রে পরিচিতি এবার সেটাতে মন দিতে চাই” ভোটে বড় বড় ডায়লগ দিয়েও বিপুল পরাজয়ের মুখ দেখেছেন তিনি! হেরেই এবার রাজনীতি ছেড়ে অভিনয়ে ফেরার ইঙ্গিত সায়ন্তিকার!

সংগ্রাম, চোখের জল, অবিশ্বাস আর সমাজের কটাক্ষ পেরিয়ে আজ তিনি টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। আর সেই কারণেই তাঁর এই গল্প শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে লড়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।

You cannot copy content of this page