তালসারি থেকে টালিগঞ্জ, অথৈ জলে সুবিচার! রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃ’ত্যুর এক মাস পর, কী কী বদলাল ইন্ডাস্ট্রিতে?

তালসারি থেকে টালিগঞ্জ, অথৈ জলে সুবিচার! রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃ’ত্যুর এক মাস পর, কী কী বদলাল ইন্ডাস্ট্রিতে?২৯ মার্চ তালসারির সমুদ্রতটে একটি ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন হঠাৎ ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের দৃশ্য ধারণের সময় জলে নামেন অভিনেতা রাহুল। সেই দৃশ্যেই তিনি তলিয়ে যান বলে জানা যায়। সঙ্গে ছিলেন সহঅভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র। ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় শুরু থেকেই একাধিক প্রশ্ন উঠতে থাকে। শুটিংয়ের অনুমতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, কারণ অভিযোগ ছিল ওড়িশা পুলিশের অনুমতি ছাড়াই কাজ চলছিল। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানানো হয়, জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। তাঁর ফুসফুসে জল ঢুকে গিয়েছিল এবং শরীরের ভিতরে বালিও পাওয়া যায়। এই তথ্য সামনে আসতেই ঘটনা ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়।

ঘটনার পরদিন থেকেই চিত্রনাট্য নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। প্রযোজনা সংস্থার তরফে জানানো হয়, গভীর জলে নামার কোনও দৃশ্য নাকি স্ক্রিপ্টে ছিল না। এমনকি, সেটে উপস্থিত অনেকে রাহুলকে জলে নামতে বারণ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়। এই বক্তব্য সামনে আসতেই নানা প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তিনি কেন জলে নামলেন। এদিকে, তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিজয়গড়ের বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে থাকেন ভক্ত ও সহকর্মীরা। ৩০ মার্চ রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়, যখন এক রাজনৈতিক নেত্রী সেখানে গেলে স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়েন। অভিযোগ ওঠে, ওই সময় কিছু স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। একই দিনে রাহুলের দেহ কলকাতায় আনা হয় এবং শেষযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়।

রাহুলের শেষযাত্রায় দেখা যায় আবেগঘন মুহূর্ত। তাঁর পরিচিত মহল এবং বামপন্থী বন্ধুরা একত্রিত হন। মরদেহ লাল পতাকায় মোড়ানো হয় এবং স্লোগান দেওয়া হয়। এই ঘটনাও নতুন বিতর্ক তৈরি করে, কারণ অনেকে মনে করেন এতে রাজনৈতিক রং লাগানো হয়েছে। ওই দিনই ইন্ডাস্ট্রির বহু পরিচিত মুখ তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হন। পরে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয় শেষকৃত্য। তাঁর ছেলে সহজ বাবার শেষ কাজ সম্পন্ন করে। এদিকে, টলিপাড়ার একাংশ শুরু থেকেই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলতে থাকে। ১ এপ্রিল থেকে প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করেন অনেকে। সংস্থার তরফে গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়ার ঘোষণাও আসে, যা ঘটনাকে আরও গুরুত্ব দেয়।

এরপর ৫ এপ্রিল বড় সিদ্ধান্ত নেয় টলিপাড়া। নিরাপত্তার দাবিতে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়। টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে বৈঠকের পর জানানো হয়, ৭ এপ্রিল থেকে কাজ বন্ধ থাকবে। শিল্পী ও কলাকুশলীরা একজোট হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই বলেন, এই ঘটনার মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের বিভাজন কিছুটা কমেছে। একই সময়ে ধারাবাহিকটির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। প্রথমে বন্ধ করার কথা বলা হলেও পরে গল্পে পরিবর্তন এনে আবার শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ৭ এপ্রিল বৈঠকের মাধ্যমে কর্মবিরতি তুলে নেওয়া হয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয় যে ওই প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে আপাতত কেউ কাজ করবেন না।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আরও কিছু বড় পরিবর্তন আসে ইন্ডাস্ট্রিতে। বৈঠকে ‘ব্যান কালচার’ বন্ধ করার কথা ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়া শিল্পীদের ফের কাজে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি ধারাবাহিক বন্ধ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে টেকনিশিয়ানদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে এই সমস্যা নিয়ে আলাদা বৈঠকও হয়। ১০ এপ্রিল একটি বড় ঘোষণা সামনে আসে, যেখানে একটি নতুন ছবিতে এক অভিনেতার প্রত্যাবর্তনের কথা জানানো হয়। যদিও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। ১২ এপ্রিল আবার বৈঠকে ঠিক হয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করা হবে না। সেই দিন একটি ধারাবাহিকের শেষ সম্প্রচারও হয়।

আরও পড়ুন: “এটা কোনও রাজনীতি নয়, এক বাঘিনীর লড়াই!” রাজনীতি থেকে দূরে থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে ‘বাঘিনী’ উল্লেখ করে বার্তা মিমির

 

মাসের শেষে এসে নতুন নিয়ম তৈরির দিকে জোর দেয় ইন্ডাস্ট্রি। ২৭ এপ্রিল প্রযোজক ও শিল্পীদের মধ্যে বৈঠকে নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নতুন কাজের নিয়ম বা এসওপি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকটি রাহুলের স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয়। উপস্থিত শিল্পীরা জানান, এই ঘটনা অনেক ভুল তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকতে হবে। যদিও এত কিছু পরিবর্তনের পরেও সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। ২৯ মার্চ ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। রাহুলের পরিবার আজও সেই উত্তর খুঁজছে। এক মাসে অনেক কিছু বদলালেও রহস্য রয়ে গেছে অমীমাংসিত।

You cannot copy content of this page