বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের ছাড়া এই ইন্ডাস্ট্রির কথা ভাবাই যায় না। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের জগতে সক্রিয় থাকা এই অভিনেত্রী শুধু সিনেমা নয়, মঞ্চ ও টেলিভিশন সব ক্ষেত্রেই নিজের ছাপ রেখেছেন। দেশভাগের পর কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কলকাতায় এসে ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ ও সংগ্রামী যাত্রা।
একটা সময় বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের মন জয় করেছিল বারবার। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘মৌচাক’, ‘নিশিপদ্ম’ এমন বহু ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। শুধু বড় পর্দায় নয়, থিয়েটারেও তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা। ‘শ্যামলী’ কিংবা ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর মতো নাটকে তাঁর অভিনয় এখনও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। এত সম্মান, এত সাফল্যের পরেও আজও তিনি একইরকমভাবে দর্শকদের ভালোবাসা আঁকড়ে বেঁচে আছেন।
আরও পড়ুনঃ ফের মানবিকতার নজির গড়লেন দেব! হঠাৎ শারীরিক অবনতি, জরুরিকালীন চিকিৎসায় সাহায্য করে এক টেকনিশিয়ানের স্ত্রীয়ের জীবন বাঁচালেন সাংসদ-অভিনেতা! টলিউডের মানবিক মুখকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার ঢেউ!
তবে ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্নটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। ঢাকায় থাকার সময় এক নেতার ভাষণ শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুই বুঝতে না পারলেও তাঁর অঙ্গভঙ্গি, বলার ধরন এতটাই ভালো লেগেছিল যে সেদিনই ঠিক করে ফেলেন তিনি বড় হয়ে নেত্রী হবেন। এমনকি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট মেয়েটি নিজের মতো করে ‘ভোট চাই’ বলে বক্তৃতাও দিতেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। ভাগ্যের ফেরে তিনি হয়ে ওঠেন অভিনেত্রী আর সেই পথেই তৈরি হয় তাঁর জীবনের আসল পরিচয়।
জীবনের নানা ওঠাপড়ার কথাও অকপটে শেয়ার করেছেন সাবিত্রী। তাঁর কথায়, জীবনে যেমন আনন্দ এসেছে, তেমনই এসেছে অনেক কষ্টও। সবকিছু পেরিয়ে আজ তিনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার পেছনে রয়েছে দর্শকদের ভালোবাসা। এক আবেগঘন মুহূর্তে তিনি বলেন, “আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু একদিন তো চলে যাব। তখন হয়তো আপনারা আমাকে ভুলেও যাবেন।” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক শিল্পীর গভীর অনুভূতি।
তবে এই কথার সঙ্গেই তিনি আবার হাসিমুখে জানিয়ে দেন, তিনি বারবার ফিরে আসতে চান দর্শকদের কাছে। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর আসল শক্তি তার দর্শক। তাই তিনি সবসময়ই চান মানুষ যেন তাঁকে মনে রাখে তাঁর কাজের মাধ্যমে। জীবনের শেষ পর্বে এসেও তাঁর এই সহজ-সরল ভাবনা আর দর্শকদের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই তাঁকে আলাদা করে দেয়। আর সেই কারণেই আজও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় শুধুই একজন অভিনেত্রী নন, তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি।






