‘আগের মতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে গান গাইতে পারতাম না, বড় মিউজিক ডিরেক্টরদের কাজও ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল!’ অল্প বয়সেই দেশজোড়া খ্যাতি, একের পর এক প্লেব্যাকের সুযোগ, হঠাৎই কেন থমকে যায় সঙ্গীতের যাত্রা? জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেও কোন লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন সারেগামাপা জয়ী শ্রেয়ান ভট্টাচার্য? কত বড় হয়েছে সে, জানেন কী করে এখন?

টেলিভিশনের রিয়ালিটি শো বহু প্রতিভাবান শিল্পীকে রাতারাতি পরিচিতি দিয়েছে। ছোটবেলায় প্রতিযোগিতার মঞ্চে সাফল্য পাওয়ার পর অনেকেই পরবর্তীকালে সংগীতজগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে অল্প বয়সে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং পরিচিতির বাইরে নিজেকে নতুন করে তৈরি করার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় অনেক শিশুশিল্পীকে। বাইরে থেকে সাফল্যের গল্প মনে হলেও, পর্দার আড়ালে তাঁদের লড়াইটা অনেক সময়ই অজানা থেকে যায়। এমনই একজন শিল্পী শ্রেয়ান ভট্টাচার্য।

জি টিভির জনপ্রিয় সংগীতের রিয়ালিটি শো ‘সারেগামাপা লিটল চ্যাম্পস’-এর মঞ্চে বিজয়ী হয়ে গোটা দেশের দর্শকের নজর কেড়েছিলেন তিনি। তার আগে বাংলা রিয়ালিটি শোতেও অংশ নিয়েছিলেন শ্রেয়ান। ছোটবেলায় তাঁর মিষ্টি কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছিলেন অসংখ্য শ্রোতা। ‘ভূতু’, ‘গুগলি’ এবং ‘হামি’র মতো ছবিতেও প্লেব্যাক করেছেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন তাঁর সংগীতজীবনে বড়সড় প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি অনিলা চট্টোপাধ্যায়ের পডকাস্টে উপস্থিত হয়ে সেই কঠিন সময়, জীবনের ওঠাপড়া এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন গায়ক। সাক্ষাৎকারে শ্রেয়ান জানান, বয়ঃসন্ধিতে তাঁর ভোকাল পরিবর্তন হতে শুরু করে।

আগে যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে গান গাইতেন, কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়ার পর সেই আত্মবিশ্বাস আর পাচ্ছিলেন না। আওয়াজের জোর কমে যাচ্ছে, আগের মতো রেঞ্জ থাকছে না বলে মনে হত তাঁর। যদিও বাস্তবে তাঁর গানের রেঞ্জ বাড়ছিল এবং তিনি আরও ভালো করার দিকেই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু সামগ্রিক কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন তিনি নিজে সেভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। এই সময়ে বলিউডের দু’জন বড় মিউজিক ডিরেক্টর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনের কারণে সেই কাজগুলি করতে পারেননি। এমনকী নিজের কণ্ঠের পরিবর্তনের বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে তাঁদের গান গেয়ে পাঠিয়েছিলেন। শ্রেয়ানের মতে, সেই সময় জোর করে কাজ করার পরিবর্তে নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে সৎ থাকাই ভালো ছিল। এই কঠিন সময়ে মা-বাবা, গুরুজি পণ্ডিত জয়ন্ত সরকার, সীমান্ত সরকার, শর্মিষ্ঠা এবং জয় সরকার তাঁর পাশে ছিলেন।

তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে গান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি শ্রেয়ান। বরং সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে সংগীতের আরও গভীরে প্রবেশ করেন। গিটার বাজানোকে আরও গুরুত্ব দেন, পিয়ানো ও তবলা নিয়েও চর্চা শুরু করেন। নিজের গান তৈরি করতে শুরু করেন, যা এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তীকালে মুম্বইয়ের অডিও গাইজ ইনস্টিটিউটে মিউজিক প্রোডাকশনের কোর্সও করেন। তাঁর উপলব্ধি হয়, শুধু গান তৈরি করলেই হবে না, সেই গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও শিল্পীকে নিতে হবে। সাক্ষাৎকারে অরিজিৎ সিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে শ্রেয়ান জানান, তাঁকে কাছ থেকে দেখে একজন শিল্পীর কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং মানুষ হিসেবে তাঁর ভালো দিকগুলি উপলব্ধি করেছেন।

অরিজিৎ তাঁকে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। পাশাপাশি বর্তমান সময়ের রিয়ালিটি শোগুলিতে প্রতিযোগিতা ও পেশাদারিত্ব বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে অংশ নিলে আরও প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। শ্রেয়ানের মতে, কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের সময় লাইভ কনসার্ট কিছুদিন বন্ধ রাখা ভালো। কারণ অনেক অনুষ্ঠানে উন্নত সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বা এফওএইচ-এর ব্যবস্থা থাকে না। ফলে শিল্পীকে বিভিন্নভাবে মানিয়ে নিয়ে গান গাইতে হয়, যা কণ্ঠের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। ছোটবেলায় জনপ্রিয়তা পাওয়ার ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনই তার চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ “আমি কোনও দিন নিজের বিধানসভা এলাকায় চাইলেও যেতে পারতাম না, উনি পছন্দ করতেন না…” ইন্দ্রনীল সেনকে নিয়ে মুখ খুলে বি*স্ফোরক রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, একই দলের সাংসদ হয়েও বিধায়কের এলাকায় ঢুকতে কেন নিতে হত অনুমতি? চন্দননগরে কী কী বাধার মুখে পড়েছিলেন তিনি?

তবে নিজের জীবনের এই অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চান না শ্রেয়ান। বর্তমানে স্বাধীন সংগীত এবং নিজস্ব কম্পোজিশন নিয়েই এগোতে চান তিনি। একইসঙ্গে বাংলা সংগীতজগতের প্রতিভাবান শিল্পীদের যথাযথ সুযোগ এবং নিজেদের গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সমস্যা নিয়েও কথা বলেছেন। তাঁর কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিদিনের রেওয়াজ, নিজের প্রতিভাকে আরও উন্নত করা এবং ভালো সংগীত তৈরি করা। ছোটবেলার পরিচিতি থেকে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন, মানসিক টানাপোড়েন পেরিয়ে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার এই যাত্রায় শ্রেয়ান এখন কতটা প্রস্তুত, সেটাই দেখার।

You cannot copy content of this page