বাংলা সংগীত জগতের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর শিলাজিৎ মজুমদার গায়ক, সুরকার, অভিনেতা সব মিলিয়ে বহু বছর ধরে তিনি নিজস্ব জায়গা তৈরি করে রেখেছেন। তাঁর গান যেমন একসময় তরুণ প্রজন্মের মনের কথা বলেছে, তেমনই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ভরা উত্থান-পতনের গল্পে। সম্প্রতি এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবনের কঠিন সময়, পারিবারিক দায়িত্ব, আর বিশেষ করে বাবাকে হারানোর পর কীভাবে জীবন বদলে গেছে সেই সব কথাই খোলাখুলি শেয়ার করেছেন। তাঁর কথায় উঠে এসেছে সংগ্রাম, হতাশা, দায়িত্ববোধ আর শেষ পর্যন্ত আবার ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা।
শিলাজিতের কথায়, জীবনের একটা সময় এমন এসেছিল যখন সব কিছু যেন একসঙ্গে ভেঙে পড়ছিল। তিনি ভেবেছিলেন কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যা কেটে যাবে, কিন্তু দিন কেটে সপ্তাহ, সপ্তাহ কেটে মাস সমস্যা থেকেই গিয়েছে। এর মধ্যেই বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে এক বড় ধাক্কা হয়ে আসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি বলেন “বাবা মারা গিয়েও যেন আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন।” কারণ, সেই কঠিন মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারেন, এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে মা, বোনের পড়াশোনা, বাড়ির ইএমআই, ব্যাংকের লোন সবকিছু সামলাতে হবে তাঁকেই।
এই সময়েই সামনে আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন আর্থিক লড়াইয়ের ছবি। সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব তাঁর ওপর পুরোপুরি এসে পড়ে। ছেলের গ্র্যাজুয়েশনের খরচ জোগাতে গিয়ে তিনি বাধ্য হন নিজের বাড়ি বন্ধক রাখতে এবং ব্যাংক থেকে লোন নিতে। HDFC-র মর্টগেজ লোনের ইএমআই (EMI) তখন নিয়মিত চাপ তৈরি করছিল, কিন্তু আয় ছিল অনিশ্চিত। হাতে টাকা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছেও সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রত্যাশামতো সাড়া পাননি। তাঁর কথায়, “অনেকের কাছে হাত পেতেও শেষমেশ একাই লড়তে হয়েছে।” টাকার টানাপোড়েন, লোনের চাপ আর পরিবারের দায়িত্ব সব মিলিয়ে সেই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়, যেখানে প্রতিদিন টিকে থাকাই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্যারিয়ারের দিক থেকেও তখন পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিল না। প্রথম অ্যালবাম সুপারহিট হলেও পরের দু’টি অ্যালবাম আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালের দিকে এসে তিনি বুঝতে পারেন, শুধু আগের সাফল্যের ওপর ভর করে থাকা যাবে না নতুন করে কিছু করতে হবে। সেই সময় চাকরি ছেড়ে মুম্বইয়ে শো করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানেও বাধা ফ্লাইট বাতিল, ট্রেন বন্ধ, লকডাউন সব মিলিয়ে একের পর এক সমস্যায় ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবুও তিনি থামেননি।
এই সমস্ত চাপের মধ্যে তিনি মানসিক দিক থেকেও ভেঙে পড়েছিলেন। নিজের কথায়, “মনে হচ্ছিল জীবনটা শূন্য হয়ে গেছে।” কিন্তু ঠিক সেই সময়ই বাবার শেখানো মূল্যবোধ তাঁকে শক্তি দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, বাবা মানে শুধু একজন মানুষ নয় দায়িত্বের প্রতীক। একজন বাবা কখনো হাল ছাড়েন না, আর তাই তিনিও হাল ছাড়েননি। সংসার চালানোর জন্য, ইএমআই মেটানোর জন্য, আবার নতুন করে কাজ শুরু করেন। ছোট ছোট শো, নতুন প্রোজেক্ট, নতুন চেষ্টা, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে গুছিয়ে নেন।
আরও পড়ুনঃ “রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমি প্ল্যানচেটে কথা বলেছি, সেটার প্রমাণ…” দাবি ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়ের! মায়ের মৃ’ত্যুর পর তাঁকে ডাকতেই প্ল্যানচেট শুরু, সেই থেকে বহু বিখ্যাত মানুষদের আত্মাকে ডেকে এনেছেন তিনি! তাদের সঙ্গে হয়েছে কী কথা? নিজের অভ্যাসের কোন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ফাঁস করলেন অভিনেতা?
শিলাজিতের এই যাত্রা শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়, বরং এক সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। শূন্য থেকে আবার উঠে দাঁড়ানো সহজ নয়, কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে তা সম্ভব। তাঁর কথায়, জীবনে কঠিন সময় আসবেই, কিন্তু সেই সময় থেকেই শেখা যায় সবচেয়ে বেশি। আজ তিনি আবার নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু সেই কঠিন দিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও বাস্তববাদী আর শক্ত করে তুলেছে। তাঁর এই গল্প অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা বিশেষ করে তাঁদের জন্য, যারা জীবনের কোনো এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিতে বসেছেন।






