বাংলা গানের পরিসরে ‘লোপামুদ্রা মিত্র’কে (Lopamudra Mitra) বরাবরই আলাদা করে চেনা যায় তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর আর ভাবনার গভীরতার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে যেমন গান গেয়ে তিনি শ্রোতার মন জয় করেছেন, তেমনই নিজের অবস্থান নিয়েও কখনও আপস করেননি। সম্প্রতি আবারও তাঁর কিছু মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে তিনি খোলাখুলি বলেছেন, এখন আর আগের মতো করে গান গাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন না। এই অনীহার পেছনে ব্যক্তিগত ক্লান্তি নয়, বরং সময়ের বদলে যাওয়া সাংস্কৃতিক পরিবেশকেই দায়ী করেছেন তিনি।
গায়িকার কথায় উঠে এসেছে আজকের দ্রুত সাফল্যকামী মানসিকতার প্রসঙ্গও। তাঁর মতে, শিল্পচর্চার জায়গায় এখন তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার লোভ বড় হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের ‘রিল’ বানিয়ে ভাইরাল হওয়াই যেন অনেকের লক্ষ্য। ধৈর্য ধরে শেখা, রেওয়াজ করা বা গানের ভেতরের অনুভবকে আয়ত্ত করার বিষয়গুলো যেন ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে। তিনি আক্ষেপের সুরেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এমন পরিবেশে শিল্পের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বর ও সৌন্দর্যও চাপে পড়ে যেতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
কাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে আলোচনায়। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টেনে তিনি জানিয়েছেন, বিশেষ দিন উদযাপনের চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দেওয়াই তাঁর স্বভাব! ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবন পেরিয়েও তিনি নিজেকে আগে একজন কর্মী হিসেবেই ভাবতে স্বচ্ছন্দ। ভালোবাসা নিয়ে প্রচলিত আবেগঘন প্রকাশভঙ্গি তাঁর সঙ্গে খুব একটা যায় না। তাই ভালোবাসার উৎসব হিসেবে পরিচিত ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’কেও তিনি বাড়তি আবেগের দিন হিসেবেই দেখেন!
তাঁর কাছে কাজই আসল অগ্রাধিকার, সেটাকেই তিনি নিজের ভালোবাসা বলে মনে করেন। তবে, এর মধ্যেও একেবারে নিরাবেগ নন তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যত্ন পাওয়ার ইচ্ছে যে মনে জায়গা করে নেয়, সেটাও স্বীকার করেছেন সহজভাবে। কখনও কখনও তাঁরও মনে হয়, কেউ যদি একটু খোঁজ নেয় বা পাশে দাঁড়ায়, তাতে মন্দ কী! আবার মজা করে বলেছেন, তিনি আর জয়, খুব বেশি ‘আদিখ্যেতা’ করতে জানেন না। তবু দেখতে দেখতে পঁচিশ বছর কেটে গেছে বেশ আনন্দেই।
আরও পড়ুনঃ “অভিনয় না শিখেই তো সফলতা পাচ্ছে…দু-তিন বছরের মধ্যেই যখন ফ্ল্যাট-গাড়ি হচ্ছে, তখন শিখবে কেন?” ২২ বছরের লড়াইয়ের পর ‘সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি’ কেনার অভিজ্ঞতা টেনে, নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে চাঁচাছোলা ভাষায় মন্তব্য অভিনেত্রী সুদীপা বসুর!
সম্পর্কের স্থায়িত্বের পেছনে হয়তো এই স্বাভাবিক, নির্ভার মনোভাবই কাজ করেছে। তাঁর বক্তব্যে যেমন রয়েছে সময়কে নিয়ে উদ্বেগ, তেমনই রয়েছে নিজের জীবনের প্রতি এক সরল দৃষ্টিভঙ্গি। শিল্পী হিসেবে তিনি পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন, প্রশ্ন তুলছেন, আবার মানুষ হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতা ও চাওয়াকেও লুকোচ্ছেন না। ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর প্রত্যাশা খুব জটিল নয়। যেমন করে এতদিন কেটে গেছে, তেমন করেই বাকি জীবনটাও আনন্দেই কাটুক। তাঁর এই অকপট স্বভাবই হয়তো তাঁকে আজও আলাদা করে রেখেছে ভিড়ের মাঝেও।






